কোচবিহার: ঘুঘুমারির হাওয়ারগাড়ি এলাকায় আল আমিন মিশন রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল দুই নাবালক ছাত্র। এরা দুজনই দশম শ্রেিণর ছাত্র। মঙ্গলবার বিষয়টি নিয়ে কোচবিহার কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। বুধবার ওই ছাত্রদের পরিবারের সদস্যরা মিশনে আসেন। বিষয়টি নিয়ে সেখানে তুমুল উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে কোচবিহার কোতোয়ালি থানা থেকে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রাজ্য শিক্ষা দপ্তর, সমাজকল্যাণ দপ্তর- কারও কোনও অনুমতি না নিয়ে ১৫০ জন নাবালককে ওই মিশন কর্তৃপক্ষ কীভাবে বছরের পর বছর সেখানে রেখেছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
কোচবিহার জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) সমরচন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘ওই মিশন এনওসি-র জন্য আমাদের কাছে কোনও আবেদন করেনি। বিষয়টি আমাদের জানা নেই।’ বিষয়টি নিয়ে জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিক ও জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক রণজিৎ নট্টকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন না তোলায় তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।
কোচবিহার-১ ব্লকের ঘুঘুমারি চৌপথি থেকে সাড়ে তিন-চার কিলোমিটার দূরে হাওয়ারগাড়ি এলাকায় কয়েক বিঘা এলাকাজুড়ে রয়েছে আল আমিন মিশন। পাঁচতলা ভবনে পড়ুয়াদের থাকার ও লেখাপড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। মিশনের চারদিকে উঁচু প্রাচীর ও তার ওপর তারকাঁটার বেড়া দেওয়া রয়েছে। রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১৫০ জন নাবালক ছাত্ররা সেখানে থাকে। এত নিরাপত্তা সত্ত্বেও দুজন কিশোর সেখান থেকে কীভাবে উধাও হয়ে গেল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিভাবকদের সূত্রে খবর, বাচ্চাদের মিশনে রাখার জন্য তাদের প্রতি মাসে মোটা টাকা গুনতে হয়। বুধবার ওই মিশনে গিয়ে দেখা যায় মিশনের সামনে বড় দরজা বন্ধ, গেটের সামনে ভিড়। হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের পরিবারের লোকজনও দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁদের দাবি, মিশন কর্তৃপক্ষ ভেতরে তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না। ক্রমশ উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তাঁদের হাতজোড় করে ভাঙা গলায় বলতে শোনা যায়, আমরা আমাদের বাচ্চাকে চাই। আমরা বছরে প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ করে এখানে বাচ্চাদের রাখি। তারপরে বাচ্চা কী করে এখান থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়? উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক ছাত্রের বাবা, ফালাকাটার ধুলাগাঁও এলাকার বাসিন্দা রেজাউল আলম বলেন, ‘শনিবার বিকেলেও ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে মিশনের প্রধান শিক্ষক ফোন করে জানান সকাল থেকে আমার ছেলেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর আমরা আসি। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করার পর থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। এখনও পর্যন্ত বাচ্চার কোনও খোঁজ নাই। আমার ছেলে কোথায় গেল, মিশন কর্তৃপক্ষ কিছু পরিষ্কার করে জানাতে পারছে না। আমি আমার বাচ্চাকে চাই।’
অপর বাচ্চার বাবা, দিনহাটার গিতালদহ-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের রতিনন্দন গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, ‘আমার ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এখানে থাকে। রবিবার দুপুরে এসে ওর মা ওর সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে। এরপর মঙ্গলবার সকালে প্রধান শিক্ষক ফোন করে জানান বাচ্চাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের ধারণা, আমার বাচ্চা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পেছনে মিশন কর্তৃপক্ষ জড়িত রয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’
মিশনের প্রধান শিক্ষক হারুন রশিদ বলেছেন, ‘প্রতিটি ঘরে ১০ জন করে ছাত্রের সঙ্গে একজন করে শিক্ষকও রাতে থাকেন। কিন্তু তারপরেও দুজন কীভাবে এখান থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল, বুঝতে পারছি না। আমরা বাচ্চা দুটিকে খুঁজে বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। তবে আমাদের হাতে একটা ভিডিও এসেছে। সেটা আমরা পুলিশকে দিয়েছি।’ একটি ছাত্রের বিছানা থেকে চিঠিও পাওয়া গিয়েছে বলে প্রধান শিক্ষকের দাবি।
যে ঘর থেকে দুই পড়ুয়া নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে সেই ঘরের অন্য পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলে, সোমবার রাত ৯টা নাগাদ আজান সেরে রাতের খাবার খেয়ে আমরা সবাই বিছানায় আসি। ওদের দুজনকে আমরা রাত ১১টা পর্যন্ত বিছানায় দেখেছি। কিন্তু তারপরের কথা জানি না। এই আবাসিক স্কুলটিকে নিয়ে অবশ্য বেশকিছু প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্যে যে কোনও ধরনের স্কুল চালাতে গেলে রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়। অথচ এই আবাসিক স্কুল থেকে ছাত্ররা অন্য কোনও স্কুলের নথিভুক্ত ছাত্র হিসাবে পরীক্ষায় বসে। এমন কোনও শিক্ষা ব্যবস্থার অনুমোদন রাজ্য থেকে নেওয়া হয়েছে কি না, তা বলতে পারেনি স্কুল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, ১৫০ জন নাবালককে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতিও চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি (সিডব্লিউসি) বা সমাজকল্যাণ দপ্তর থেকে নেওয়ার কোনও প্রমাণও আল আমিন মিশন কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেননি। যদিও এই নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক হারুণ রশিদ দাবি করেন, তাঁদের কাছে কেন্দ্রের স্কুল এডুকেশন দপ্তরের অনুমতি রয়েছে।

