রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এসআইআর এখন যোগীর গলার কাঁটা

শেষ আপডেট:

 

  • আশিস ঘোষ 

নেহাত তিনি মুণ্ডিতমস্তক। নইলে এই প্রবল শীতে অজয় সিং বিস্টের মাথার চুল খাড়া হয়ে যাওয়ার কথা! এসআইআর-এ বিরোধীদের কচুকাটা করা যাবে বলে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে ময়দানে নেমেছিলেন বটে, এখন মাঝপথে দিশেহারা তিনি। যাঁকে দেশ যোগী আদিত্যনাথ নামে চেনে। এসআইআর-এর প্রথম চোটে তাঁর রাজ্য উত্তরপ্রদেশে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ গিয়েছে ২ কোটি ৮৯ লাখ নাম। শতকরা হিসেবে মোট ভোটারের ১৮.৭০ শতাংশ! খোদ যোগীজি জানিয়েছেন, বাদ পড়াদের ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ বিজেপির ভোটার।

একেবারে গেল গেল অবস্থা এখন। বাকি দেশে যখন নাম ছাঁটাইয়ের তোড়জোড়, যোগীর রাজ্যে তখন নাম জোড়ো অভিযান শুরু হয়েছে। বশংবদ নির্বাচন কমিশন একের পর এক সময়সীমা বাড়িয়েই চলেছে। পুরোদমে চলছে নাম ঢোকানোর কাজ। বিজেপি নেতৃত্ব দলের ‘কারিয়াকর্তা’-দের পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতি বুথে কম সে কম দুশো নাম জুড়তে হবে।

এই খসড়া তালিকা বের হওয়ার পর যোগী আদিত্যনাথ আর সে রাজ্যের বিজেপি সভাপতি পঙ্কজ চৌধুরী দলের সব মন্ত্রী, এমপি, এমএলএম, দলের নানা পদাধিকারী ও জেলা সভাপতিদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিং করেছেন। সেই বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, কেস গুরুতর। যোগী বলেছেন, বাদ পড়া লোকজন বিরোধী দলের নন। তাঁদের ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ বিজেপির। তাই হেলাফেলা বরদাস্ত নয়। নাম ঢোকাও।

বছর ঘুরলে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভার ভোট। তার আগে এই ঘোর এসআইআর কালে ওই রাজ্যের ১ লাখ ৭৭ হাজার বুথে গড়ে ২০০ নাম ঢোকাতে পারলে সাড়ে তিন কোটি ভোটার যোগ হবে। এদের মধ্যে রয়েছেন নতুন ভোটার, ম্যাপিং না হওয়া, নথি দেখাতে না পারা ভোটাররা। ধরে নেওয়া হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশে মোট ভোটার সাড়ে পনেরো কোটি।

যোগীর কড়া নির্দেশ, যাঁরা অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছেন, তাঁদের খুঁজে বের করে উত্তরপ্রদেশেই নাম লেখাতে বলতে হবে। যেমন আদতে উত্তরপ্রদেশের কোনও বাসিন্দা দিল্লির ভোটার হলে তাঁকে নিজের রাজ্যে নাম তুলতে বলা হবে। আগামী পাঁচ বছর তো দিল্লিতে কোনও ভোট নেই। যাঁদের উত্তরপ্রদেশেই শহর আর গ্রাম- দু’জায়গায় নাম আছে, তাঁদের কাছে আবার যেতে বলা হয়েছে।

হিসেব করে দেখা যাচ্ছে, খাস লখনউয়ে বাদ পড়েছে প্রায় ৩০ ভাগ ভোটার। গাজিয়াবাদে ২৮ পার্সেন্ট। একইভাবে কানপুর, আগ্রা, এলাহাবাদ, মিরাটের মতো বড় শহরে ঢালাও নাম কাটা পড়েছে। এমন সব কেন্দ্র আছে, যেখানে বিজেপি ৫ হাজার থেকে কুড়ি হাজারে জিতেছিল, সেখানে লাখখানেক নাম কাটা গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মুসলিম বহুল জেলাগুলোয় ১৩ থেকে ২০ পার্সেন্ট ভোটারের নাম কাটা পড়েছে। সবথেকে বেশি সম্ভল জেলায়, ২০.২৯ পার্সেন্ট, আলিগড়ে ১৮.৬০, মুজফফরনগরে ১৬.২৯ ও মউ কেন্দ্রে ১৭.৫২ পার্সেন্ট।

উত্তরপ্রদেশে এখন বিজেপির কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে উধাও ভোটারদের খুঁজে বের করা। নাম তোলার জন্য গাদা গাদা ৬ নম্বর ফর্ম বিলি করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, এই কাজের কতটা কী হল, প্রতিদিন তার রিপোর্ট দিল্লিতে পাঠাতে হবে। আগামী ১৭ জানুয়ারি বৈঠকে বসে ক্ষয়ক্ষতির হিসেবনিকেশ করা হবে। এসআইআর-এ নাম কাটা নিয়ে বিজেপির এই কপাল চাপড়ানোর কারণ একটা রাজনৈতিক অঙ্ক থেকে বোঝা যায়।

যেসব কেন্দ্রে খুব কম ফারাকে জিতেছিল পদ্মফুল, সেসব কেন্দ্রে বাদ পড়া বিপুল সংখ্যক ভোটারের অধিকাংশ হিন্দু। সম্ভাব্য বিজেপি সমর্থকও বটে। নমুনা হিসেবে বারাবাঁকির রামনগর কেন্দ্রের কথা বলা হচ্ছে। ২০২২ সালের ভোটে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী জিতেছিলেন মাত্র ২৬১ ভোটে। সেখানে নাম নেই ৫৪ হাজারের বেশি। কুর্সি সিটে বিজেপি জিতেছিল ২১৭ ভোটে। সেখানে উধাও ৪৭ হাজার ভোটার। বিজনৌরের ধামপুরে ব্যবধান ছিল ২০৩ ভোটের। সেখানে নাম বাদ গিয়েছে ৪৭ হাজারের।

ফলে এবার যে সব হিসেব ওলটপালট হয়ে যেতে পারে, তা বোঝা কঠিন নয়। উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস কোনও হিসেবে আসে না। তেমনই আসে না তাদের প্রতিক্রিয়া। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব মনে করছেন, কোনও না কোনও ষড়যন্ত্র চলছে। গোটা এসআইআরটা হচ্ছে পিডিএ-কে মুছে দেওয়ার চক্রান্ত। পিডিএ মানে হল পিছড়া, দলিত এবং সংখ্যালঘু। একেবারে ছক কষে তাদের ভোট কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

একইসঙ্গে রাজ্যে পঞ্চায়েতের ভোটার লিস্ট তৈরি করেছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। সেই তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা বিধানসভার ভোটের তালিকা থেকে বেশি। একই বিএলও দু’রকমের তালিকা তৈরি করেন কীভাবে- প্রশ্ন অখিলেশের। বিধানসভায় যেখানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৫৬ লাখ, সেখানে পঞ্চায়েতের লিস্টে ১২ কোটি ৬৯ লাখ হয় কী করে?

 

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

কাঁটাতারের ওপারে ‘সবুজ’ বিপদ!

ধৃতিমান সরকার ঢাকার মসনদে ধানের শিষের প্রত্যাবর্তন কি সত্যিই স্বস্তির?...

ভাগ্যিস জন অসন্তোষ আছে, পদ্ম তাই টক্করে

গৌতম সরকার ভোটের ঢাকে কাঠি পড়লে আরেকটা বাদ্যি বাজতে শুরু...

হাসিনাকে আসলে ভোলেনি বাংলাদেশ

রূপায়ণ ভট্টাচার্য শিলিগুড়ি, ইসলামপুর বা জলপাইগুড়ি থেকে পঞ্চগড় খুব কাছেই।...

শূন্যের ভাগ নিয়েও খুব ব্যস্ত বামেরা

আশিস ঘোষ  এই তো সেদিনের কথা। বামফ্রন্টের বৈঠক থাকলে আমাদের...