উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: আধুনিক জীবনযাত্রা, দূষণ ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ক্যানসারের বিভিন্ন প্রকারভেদের মধ্যে ইউরোলজিক্যাল ক্যানসার (Urological Cancer) বা মূত্রতন্ত্রের ক্যানসার পুরুষ ও মহিলা- উভয়ের ক্ষেত্রেই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আশার কথা হল, সঠিক সময়ে শনাক্ত করতে পারলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব। লিখেছেন শিবমন্দিরের এশিয়ান ইনস্টিটউট অফ নেফ্রোলজি অ্যান্ড ইউরোলজির কনসালট্যান্ট ইউরোলজিস্ট ডাঃ জয়দীপ ঘোষ।
প্রকারভেদ


মূত্রতন্ত্রের ক্যানসার বলতে মূলত প্রস্টেট, মূত্রথলি, কিডনি, আপার ট্র্যাক্ট ইউরোথেলিয়াল ক্যানসার, পেনাইল এবং টেস্টিকুলার ক্যানসারকে বোঝায়। প্রতিটি ক্যানসারের ধরন এবং তার প্রভাব শরীরের ওপর আলাদাভাবে পড়ে।
ঝুঁকির কারণ
চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ইউরোলজিক্যাল ক্যানসারের পেছনে কিছু সাধারণ কারণ থাকে। যেমন –
তামাক সেবন – বিড়ি, সিগারেট বা জর্দা জাতীয় তামাকজাত দ্রব্য ক্যানসারের প্রধান কারণ।
রাসায়নিকের প্রভাব – ডাই, রাবার, রং বা কালির কারখানায় যাঁরা দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন, তাঁদের ঝুঁকি বেশি।
জেনেটিক কারণ – বংশে কারও ক্যানসার থাকলে সচেতন থাকা জরুরি।
জীবনযাপন – অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রতিরোধের উপায়
ধূমপান ত্যাগ করা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দ্রুত এইচপিভি ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত।
প্রস্টেট ক্যানসারঃ পুরুষদের আতঙ্ক
এটি পুরুষদের মধ্যে অত্যন্ত প্রচলিত একটি রোগ যা খুব ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে শিকড় ছড়ায়।
লক্ষণ ও ঝুঁকি – প্রধানত ৫০ বছরের বেশি বয়সিদের এই রোগের ঝুঁকি রয়েছে। বংশগতভাবে ‘BRCA-2’ জিনের উপস্থিতি থাকলে বা বাবা-ভাইয়ের এই রোগ থাকলে ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। লক্ষণ হিসেবে প্রস্রাবের গতি কমে যাওয়া বা প্রস্রাবে রক্ত আসতে পারে।
স্ক্রিনিং ও রোগনির্ণয় – ৫০ বছর পেরোলে পুরুষদের নিয়মিত পিএসএ পরীক্ষা করানো উচিত। শারীরিক পরীক্ষার জন্য ডিআরই এবং প্রয়োজনে মাল্টিপ্যারামেট্রিক এমআরআই ও বায়োপসি করা হয়।
চিকিৎসা – ক্যানসারের পর্যায় বুঝে অস্ত্রোপচার (র্যাডিকাল প্রোস্টেক্টমি), রেডিয়েশন বা হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকি কম থাকলে ‘অ্যাকটিভ সারভেলান্স’ বা কড়া পর্যবেক্ষণেও রাখা হয়।
মূত্রাশয় ক্যানসার
এটি প্রস্টেটের পরেই দ্বিতীয় সর্বাধিক ইউরোলজিক্যাল ক্যানসার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৬০ বছরের বেশি বয়সিরা এই রোগে আক্রান্ত হন।
লক্ষণ – প্রস্রাবের সঙ্গে ব্যথাহীন রক্তক্ষরণ এবং বারবার প্রস্রাবের বেগ অনুভব করা।
চিকিৎসা – টিউমার পেশির গভীরে না থাকলে এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে তা অপসারণ করা হয়। কিন্তু রোগটি গভীরে ছড়িয়ে পড়লে (মাসল-ইনভেসিভ) কেমোথেরাপি বা সম্পূর্ণ মূত্রথলি অপসারণের মতো বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে।
কিডনি ক্যানসারঃ সাইলেন্ট কিলার
কিডনি ক্যানসার বাচ্চা থেকে বুড়ো- যে কোনও বয়সেই হতে পারে।
লক্ষণ – পেটে অস্বাভাবিক কোনও দলা অনুভব করা, অসহ্য ব্যথা বা প্রস্রাবে রক্ত আসা এই রোগের প্রধান লক্ষণ। এছাড়া জ্বর, অবসাদ বা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়াও অশুভ ইঙ্গিত হতে পারে।
চিকিৎসা – এখানে রেডিও বা কেমোথেরাপি খুব একটা কাজ করে না। সার্জারি বা নেফ্রোক্টমিই প্রধান সমাধান। ছোট টিউমারে আংশিক এবং বড় টিউমারে সম্পূর্ণ কিডনি অপসারণ করা হয়। রোগ ছড়িয়ে পড়লে টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি ব্যবহার করা হয়।
পেনাইল ও টেস্টিকুলার ক্যানসারঃ গোপনীয়তা নয়
পেনাইল ক্যানসার প্রধানত অপরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণের কারণে হয়। ৫০-৭০ বছর বয়সিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে টেস্টিকুলার ক্যানসার ২০-৪০ বছর বয়সি তরুণদের হতে পারে।
লক্ষণ – পেনিসের ওপর ব্যথাহীন আলসার বা ক্ষত যা সারছে না কিংবা অণ্ডকোষে শক্ত ব্যথাহীন পিণ্ড।
প্রতিকার – অণ্ডকোষের ক্যানসার শুরুতে ধরা পড়লে এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। পেনাইল ক্যানসার রোধে পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ যৌন সম্পর্ক খুব জরুরি।
আপার ট্র্যাক্ট ইউরোথেলিয়াল ক্যানসার
এটি সরাসরি কিডনির পাইপ থেকে জন্ম নেয়। সাধারণত যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে পেইনকিলার বা ব্যথানাশক ওষুধ খান, তাঁদের এই ঝুঁকি বেশি থাকে। সিটি ইউরোগ্রাফি ও এন্ডোস্কোপিক বায়োপসির মাধ্যমে এটি শনাক্ত করে কেমোথেরাপি ও সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
ক্যানসার মানেই শেষ নয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এখন অনেক অসাধ্য সাধন হচ্ছে। তবে ঘরোয়া টোটকা বা ভয় পেয়ে লুকিয়ে না থেকে, যে কোনও অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সচেতনতাই জীবন বাঁচানোর প্রথম ধাপ।

