Uterine Fibroids Treatment | ফাইব্রয়েড মানেই অপারেশন নয়

শেষ আপডেট:

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: আজকাল সচেতনতা বাড়ার ফলে অনেক মহিলাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা আল্ট্রাসাউন্ড করান। আর এই আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট হাতে পেলেই অনেকসময় একটি শব্দ দেখে পিলে চমকে ওঠে ‘ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড’, যাকে সাধারণত আমরা জরায়ুর টিউমার বলে জানি (Uterine Fibroids Treatment)। রিপোর্ট দেখার পর প্রথম যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হল, ‘এবার কি তাহলে অপারেশন করাতে হবে?’ মনের কোণে বাসা বাঁধে ক্যানসারের ভয়। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ফাইব্রয়েড মানেই যেমন ক্যানসার নয়, তেমনই ফাইব্রয়েড মানেই অপারেশন বা জরায়ু বাদ দেওয়া নয়। সঠিক সময়ে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ধাপে ধাপে চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। লিখেছেন কোচবিহারের পিকে সাহা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট অবস্টেট্রিশিয়ান ও গাইনিকলজিস্ট ডাঃ নীলাব্জ চট্টোপাধ্যায়

ফাইব্রয়েড কী

সহজ কথায় ফাইব্রয়েড হল জরায়ুর পেশির একধরনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা ‘বিনাইন টিউমার’। এটি ক্যানসার নয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিপজ্জনক নয়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মহিলার শরীরে জীবনের কোনও না কোনও সময়ে ফাইব্রয়েড তৈরি হয়। তবে স্বস্তির বিষয়, এর সিংহভাগই কোনও উপসর্গ তৈরি করে না এবং জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়। জরায়ুর ভেতরের দেওয়ালে, পেশির স্তরে কিংবা বাইরের দিকে – ফাইব্রয়েড যে কোনও অবস্থানেই থাকতে পারে।

কখন প্রয়োজন চিকিৎসা, কখন নয়

অনেক মহিলা চিকিৎসকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘শরীরে টিউমার নিয়ে থাকা কি ঠিক?’ বাস্তব সত্য হল, সব ফাইব্রয়েডের চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। যদি আপনার আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্টে ফাইব্রয়েড ধরা পড়ে কিন্তু মাসিক চক্র নিয়মিত ও স্বাভাবিক হয়, পেটে অতিরিক্ত ব্যথা বা শারীরিক অস্বস্তি না হয়, শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক থাকে, প্রস্রাবে কোনও সমস্যা বা তলপেটে অতিরিক্ত চাপের অনুভূতি না হয় তাহলে শুধু নির্দিষ্ট সময় অন্তর (সাধারণত বছরে একবার) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো-আপ বা আল্ট্রাসাউন্ড করালেই যথেষ্ট।

কখন সতর্ক হবেন

ফাইব্রয়েড থাকলে কিছু বিশেষ লক্ষণের দিকে নজর রাখা জরুরি। নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত–

অতিরিক্ত রক্তপাত : মাসিকের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ হওয়া কিংবা মাসিক অনেকদিন ধরে চলা।

রক্তের চাকা : মাসিকের সময় বড় বড় ‘ক্লট’ বেরোনো

রক্তাল্পতা : অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া, ফলে ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

তীব্র ব্যথা : ঋতুস্রাবের সময় অসহ্য যন্ত্রণা বা কোমরে-পিঠে টান ধরা ব্যথা।

চাপজনিত সমস্যা : ফাইব্রয়েড বড় হয়ে গেলে তা মূত্রাশয় বা মলাশয়ের ওপর চাপ দেয়। ফলে ঘনঘন প্রস্রাব বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে।

বন্ধ্যাত্ব : অনেকসময় ফাইব্রয়েডের অবস্থান এমন জায়গায় হয়, যাতে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে বা বারবার গর্ভপাত হতে পারে।

অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব কি না

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অপারেশন ছাড়াও একাধিক কার্যকরী উপায়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। েযমন-

ওষুধের প্রয়োগ : কিছু হরমোনাল ও নন-হরমোনাল ওষুধ দিয়ে অতিরিক্ত রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ব্যথা কমানো যায়। তাছাড়া এটি ফাইব্রয়েডকে পুরোপুরি নির্মূল না করলেও এর বৃদ্ধি কমিয়ে দেয় এবং উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখে।

মিরেনা : এটি একটি বিশেষ ধরনের হরমোনাল ডিভাইস (আইইউসিডি), যা জরায়ুর ভেতরে বসিয়ে দেওয়া হয়। ছোট বা মাঝারি মাপের ফাইব্রয়েডের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকরী। এটি জরায়ুর আবরণকে পাতলা রাখে, ফলে রক্তপাত ও ব্যথা কমে যায়।

ইউটেরাইন আর্টারি এমবোলাইজেশন (ইউএই) : এটি একটি আধুনিক পদ্ধতি যেখানে জরায়ুর রক্তনালিতে ছোট কণা পাঠিয়ে ফাইব্রয়েডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে টিউমারটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়।

অপারেশন : যখন বিকল্প নেই

যদি ফাইব্রয়েড অত্যন্ত বড় হয়ে যায় বা ওষুধের মাধ্যমে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তখনই অপারেশনের কথা ভাবা হয়। তবে এখন আর পেট কেটে বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে না সবসময়। বরং আধুনিক কিছু পদ্ধতির সাহায্যে সহজেই ফাইব্রয়েড সরানো সম্ভব –

হিস্টেরোস্কোপি : যদি ফাইব্রয়েড জরায়ুর গহ্বরের ভেতরে থাকে, তাহলে কোনও কাটাছেঁড়া ছাড়াই যোনিপথ দিয়ে হিস্টেরোস্কপির সাহায্যে সেটি সরানো সম্ভব। রোগী ওইদিনই বাড়ি ফিরতে পারেন।

ল্যাপারোস্কোপি : পেটে ছোট ছোট ফুটো করে সূক্ষ্ম যন্ত্রের মাধ্যমে ফাইব্রয়েড বের করে আনা হয়। এতে রক্তক্ষরণ কম হয়, দাগ থাকে না বললেই চলে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মায়োমেক্টমি : অনেক ক্ষেত্রে রোগী সন্তান নিতে চাইলে শুধু টিউমারটি বাদ দেওয়া হয় (জরায়ু নয়), একে মায়োমেকটমি বলে।

হিস্টেরেক্টমি : যদি ফাইব্রয়েড সংখ্যায় অনেক বেশি হয় এবং রোগীর বয়স বা শারীরিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য কোনও উপায় না থাকে, তখনই শুধু জরায়ু বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে যা-ই করুন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিন্তু রোগী ও চিকিৎসক মিলেই নেওয়া উচিত।

ক্যানসারের ভয় কি অমূলক

ফাইব্রয়েড নিয়ে সবচেয়ে বড় ভীতি হল ক্যানসার। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৯৯ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড থেকে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে যদি মেনোপজ বা ঋতুনিবৃত্তির পর হঠাৎ কোনও ফাইব্রয়েড দ্রুত বাড়তে শুরু করে, তাহলে বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

জরায়ুর ফাইব্রয়েড মানেই জীবন শেষ- এমন ধারণা একদম ভুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি শুধু একটি শারীরিক পরিবর্তন, যা সাধারণ জীবনযাপনে বাধা দেয় না। তাই বলে অবহেলাও করবেন না। আধুনিক চিকিৎসায় এখন জরায়ু বাঁচিয়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়া সম্ভব। মনে রাখবেন ভয় নয়, সঠিক তথ্য এবং চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনাই আপনার সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

ORS | প্যাকেটবন্দি ওআরএস কি সবার জন্য? সুস্থ থাকতে জেনে নিন এর সঠিক নিয়মবিধি

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: গরমের দাপট বাড়তেই ওষুধের দোকানগুলোতে...

Yogurt | ভুল উপায়ে দই খাচ্ছেন না তো? বদহজম ও অ্যাসিডিটি রুখতে মেনে চলুন এই টিপস

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে...

Health Benefits | হাড়ের সুরক্ষা থেকে রক্তাল্পতা দূর, সুস্থ থাকতে পাতে রাখুন ‘মহৌষধ’ মানকচু

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: বাঙালির রান্নাঘরে এক সময় মানকচুর...

CM Suvendu Adhikari | হিমন্তের শপথে আমন্ত্রিত শুভেন্দু, আগামীকালই অসমে যাচ্ছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী!

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য অসমে (Assam)...