রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

Uttar Dinajpur | গোতিতে বর্ষায় স্কুল যাওয়া বন্ধ, প্রশাসন উদাসীন, চাঁদা তুলে সাঁকো তৈরি গ্রামবাসীর

শেষ আপডেট:

মহম্মদ আশরাফুল হক, গোয়ালপোখর: উদ্দেশ্য ছিল, সেতু নির্মাণ হবে পিতানুর ওপর। যদিও, শুধুমাত্র দুটো পিলার আর তার মাঝের অংশে কংক্রিটের ছাদটুকু হয়েছে। গ্রামবাসীদের কেউ বলছেন, দশ বছর আগে অর্ধনির্মিত অবস্থায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে কাজ। কারও দাবি, তারও বেশি সময় ধরে এমন অবস্থা। ছবিটা উত্তর দিনাজপুর (Uttar Dinajpur) জেলার গোয়ালপোখর (Goalpokhar)-১ ব্লকের গোতি গ্রাম পঞ্চায়েতের।

নদীর ওপারে গোতি গ্রামে অবস্থিত গোতি হাইস্কুল। সেদিকেই রয়েছে বাজার। ওই পথে পড়ে গোয়াগঁাও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, লোধন গ্রামীণ হাসপাতাল। এপাড়ে আঙ্গুরভাসা বনবাড়ি, বোচাগাড়ি, আদিবাসীপাড়া, সেলিয়ার মতো গ্রামগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র উপায় ওই নদী পেরোনো। নয়তো, ঘুরপথে প্রায় ১০ কিলোমিটার যেতে হবে।

বছরের অন্য সময় পিতানুর খাতে নেমে হেঁটে ওপাড়ে যান হাইস্কুলের পড়ুয়া সহ এলাকাবাসী। যখন হঁাটুজল থাকে, তখন গুটিয়ে নিতে হয় প্যান্ট। কঁাধে তুলে নিতে হয় সবুজ সাথীর সাইকেলটি। এভাবেই কেটে গিয়েছে মাসের পর মাস। দুর্ভোগ বাড়ে, যখন বর্ষা আসে। ওই ক’টা মাস স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দিতে হয় অনেককে। প্রশাসনের নানা মহলের দরজায় কড়া নেড়েও লাভ হয়নি। তাই গত বর্ষার পর আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ নিজেরাই উদ্যোগী হন। প্রায় দেড় লক্ষ টাকা চাঁদা তুলে পিলারের ওপর সঁাকো তৈরি করেছেন। আপাতত তার ওপর দিয়েই পারাপার চলছে। আগামী বর্ষায় সেটির অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

কথা হচ্ছিল গোতি হাইস্কুলের দশম শ্রেণির পড়ুয়া তনুশ্রী সিংহ, আফরোজা খাতুন ও মালতী হেমব্রমের সঙ্গে। ওদের কেউ আঙ্গুরভাসা বনবাড়ির বাসিন্দা। কারও বাড়ি সেলিয়া কিংবা আদিবাসীপাড়ায়। সমস্যা দীর্ঘদিনের। অভিযোগ, প্রশাসন সবকিছু জেনেও উদাসীন। অসহায় পড়ুয়াদের প্রশ্ন, সেতু তৈরি হওয়া ভীষণ জরুরি। বর্ষাকালে স্কুলে যেতে পারি না। এখন তো আমরা ক্লাস টেনে পড়ি। সামনে মাধ্যমিক। কী করব এবার, ভাবলেই ভয় লাগে। এই জনপদের অধিকাংশ পড়ুয়াই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। অথচ, স্বপ্ন দেখার সাহস বুকে নিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে বেহাল পরিকাঠামোর সঙ্গে।

গোতি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান বীণা দাস জানালেন, এই সমস্যা তঁাদের জানা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরেও নাকি আনা হয়েছে। গোয়ালপোখর ১ নম্বর ব্লকের বিডিও কৌশিক মল্লিকের বক্তব্য, ‘সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করতে প্রশাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হবে।’ প্রশ্ন ওঠে, এই ‘খুব তাড়াতাড়ি’র অপেক্ষা শেষ হতে আর কতদিন ভোগান্তি সইতে হবে স্থানীয়দের।

ছাত্রছাত্রীরা নড়বড়ে সঁাকোর ওপর দিয়েই স্কুলে যাওয়া-আসা করছে এখন। এপাড়ের গ্রামগুলো থেকে কৃষকরা নিজের উৎপাদিত ফসল নিয়ে যাচ্ছেন হাঁটে। বাজারে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় মহসিন আলি একজন অভিভাবক। বলছিলেন, ‘ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক অভাবে আমাদের পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। কিন্তু সন্তানরা যাতে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দঁাড়াতে পারে, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাই যদি এমন হয়, তবে কী করব বলুন। সরকারি স্কুল অনেকটা দূরে। আশপাশের গ্রামের ছেলেমেয়েরা ওখানেই পড়তে যায়।’ গোতি হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রঞ্জিত দাস বললেন, ‘এই কারণে বহু ছাত্রছাত্রী অনিয়মিত স্কুলে আসে। তবে, নির্দিষ্টভাবে আঙ্গুরভাসা বনবাড়ির পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হচ্ছে কি না, জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব।’

সাঁকোর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তাই বাবা-মায়েরা ঝঁুকি নিতে চান না। কেউ হাত ধরে, কেউবা কোলে তুলে নিয়ে সঁাকো পার করিয়ে দেন। আবার, স্কুল ছুটির পর নিয়ে আসেন। সুনীতা হেমব্রম নামে এক অভিভাবকের আক্ষেপ, ‘একবার সাঁকো থেকে পড়ে গেলে কী হবে, ভাবতে পারছেন! অথচ, সরকারি তরফে কোনও হেলদোল নেই।’ নরেশচন্দ্র সিংহের দাবি,‘পাঁচ-সাতটি গ্রামের লোক মিলে চাঁদা তুলেছি। দেড় লক্ষ টাকার মতো উঠেছিল। সাধারণ গরিব মানুষের অর্থ দিয়েই সাঁকোটি তৈরি করা হল। এটা তো স্থায়ী সমাধান নয়। সেতু বা কালভার্ট না হলে হয়তো অনেককে লেখাপড়া মাঝপথে ছাড়তে হবে।’ তাঁর মতে, জীবনযাত্রা সহজ হলে শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহ আরও বাড়ত।

Sushmita Ghosh
Sushmita Ghoshhttps://uttarbangasambad.com/
Sushmita Ghosh is working as Sub Editor Since 2018. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Digital. She is involved in Copy Editing, Uploading in website and various social media platforms.

Share post:

Popular

More like this
Related

Chanchal Super Specialty Hospital | পরিদর্শনের চক্করে ভোলবদল! চেনা দুর্গন্ধ উধাও, একদিনের জন্য ‘সুপার’ হয়ে উঠল চাঁচল হাসপাতাল

সামসী: রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের ডিরেক্টর অফ হেলথ সার্ভিস ড....

Bamangola | ভক্তদের মনস্কামনা পূরণের এক পুণ্যভূমি, ইতিহাস ও পুরাণের মিলনক্ষেত্র তিলভাণ্ডেশ্বর

স্বপনকুমার চক্রবর্তী, বামনগোলা: প্রাচীন বটবৃক্ষের শিকড় আর ডালপালায় মোড়া...

Bateshwar Temple | ধ্বংসস্তূপের মাঝে আজও জীবন্ত প্রাচীন সভ্যতা, অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বটেশ্বর মন্দির

অভিরূপ দে, ময়নাগুড়ি: দূর থেকে দেখলে বোঝা মুশকিল যে...

Mainaguri | ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার মিলনস্থল, পর্যটন মানচিত্রে নতুন রূপ পেল নবম শতকের জটিলেশ্বর

অভিরূপ দে, ময়নাগুড়ি: ময়নাগুড়ি ব্লকের (Mainaguri) চূড়াভাণ্ডার গ্রাম পঞ্চায়েত...