মহম্মদ আশরাফুল হক, চাকুলিয়া: পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সহপাঠীদের চোখ যখন বইয়ের পাতায়, তখন কলকাতা থেকে তার কানে পৌঁছাল বাবার মৃত্যুসংবাদ। শুক্রবার সকালে যখন পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে, তখন বাড়ির উঠোনে পৌঁছাল বাবার নিথর দেহ। আত্মীয়পরিজনদের ভিড় থেকে উঠছে কান্নার রোল। কিন্তু সাজিদ আলি জলকে চোখের মধ্যে সংবরণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে পড়ল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে। বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের শ্রীজৈন কানকি বিদ্যামন্দিরে। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে বাবাকে করল সমাধিস্থ।
দুঃখকষ্টের মাঝেও অদম্য ইচ্ছাশক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল উত্তর দিনাজপুরের (Uttar Dinajpur) চাকুলিয়া হাইস্কুলের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সাজিদ। বাবার মৃত্যুর শোক সামলে যেভাবে শুক্রবার সে পরীক্ষা দিয়েছে, তা দেখে তার ইচ্ছেশক্তিকে কুর্নিশ না জানিয়ে থাকতে পারছেন না কেউই। চাকুলিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল আলম বলেন, ‘ঘটনা হৃদয়বিদারক। ভেবেছিলাম পরীক্ষায় বসা হবে না সাজিদের। তার অদম্য জেদ ও ইচ্ছেশক্তি দেখে স্কুলের আমরা সব শিক্ষক গর্বিত। স্কুলের তরফে ছেলেটির স্বপ্ন পূরণে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’ স্থানীয় বাসিন্দা মহম্মদ ইসরাইল বলেন, ‘গ্রামের সকলে যখন বলছিলাম এমন অবস্থায় পরীক্ষায় না বসতে, তখম সাজিদ মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে। নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। ওর এই সংকল্প ভবিষ্যতে অনেক ছাত্রছাত্রীকে অনুপ্রাণিত করবে।’ বাবাকে সমাধিস্থ করার পর সাজিদ বলছে, ‘বাবা সবসময় চাইতেন আমি বড় হয়ে কিছু একটা করি, পরিবারের হাল ধরি। তাঁর সেই স্বপ্নপূরণ করতেই আমার পরীক্ষায় বসা। লড়াই চালিয়ে যাব। শোককে জয় করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা।’
সাজিদের বাবা সাগির আলি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসা চলছিল কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। শুক্রবার সকালে নিথর দেহ গ্রামের বাড়ি চাকুলিয়ার আমলিয়ায় পৌঁছালে পুরো পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। চোখে জল নিয়ে ভিড় জমান পড়শি এবং দূরের আত্মীয়রা। সকলেরই নজর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সাজিদের দিকে। সাজিদের মনে ছিল বাবার ইচ্ছে পূরণ। তাই সাজিদের ঘটনাটি শুধু একটি পরীক্ষার গল্প নয়, বরং জীবনের লড়াইয়ে অটল থাকার, স্বপ্নকে জীবিত রাখার এক অনন্য উদাহরণ।

