রাহুল দাস
‘একটি জাতিকে জানতে হলে, তার মায়েদের শিক্ষাকে জানো’— এই কথাটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল সেই মানুষটির জীবনে, যাঁর শৈশব গড়ে উঠেছিল ঘরের কোণে, কিন্তু চিন্তা বিস্তৃত হয়েছিল বিশ্বপটভূমিতে। তিনি স্বামী বিবেকানন্দ।
বিবেকানন্দের জীবনচর্চায় বহু আলো পড়েছে, তবে তাঁর ভাবনার শিকড়— তাঁর মা-বাবার গভীর শিক্ষার প্রভাব এতে ছিল সবচেয়ে বেশি। ছোটবেলায় একবার বিনা দোষে স্কুলে মার খেয়ে বাড়ি ফিরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। মা ভুবনেশ্বরী দেবী স্নেহময় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘যদি তুই দোষ না করিস, তবে ভয় কীসের? সত্যকে আঁকড়ে ধর।’ সেই একটি বাক্য একদিন শিকাগোর মঞ্চে বজ্রনিনাদের মতো ধ্বনিত হবে, তা কে জানত!
তাঁর পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন আলোকিত চিন্তাধারার মানুষ। একদিন ছেলের মুখে খারাপ ভাষা শুনে শাস্তি না দিয়ে, দরজায় ঝুলিয়ে দিলেন সেই শব্দগুলির তালিকা। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল— ছেলে যেন নিজেই তার কর্মের জন্য লজ্জিত হয়। সেই ঘটনাই হয়তো জন্ম দিয়েছিল বিবেকের প্রথম আলো। এই পারিবারিক শিক্ষার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল নরেন। দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সংস্পর্শে এসে তিনি বুঝেছিলেন— ধর্ম কেবল উপাসনা নয়, সেবাও এক ধরনের ঈশ্বরসাধনা। ভারতব্যাপী তাঁর যাত্রাপথে তিনি দেখেছেন দারিদ্র্য, অসাম্য, অন্যায়— সেখান থেকেই গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনদর্শন।
তিনি বলেছিলেন— ‘নিজেকে দুর্বল ভাবা পাপ।’ আজকের আত্মবিশ্বাস হারানো সমাজে তাঁর এই বাক্য যেন অন্তর্জাগরণের মন্ত্র। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল—‘জাগো, ওঠো, এবং লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থেমো না।’ ধর্মের নামে যখন বিভাজনের বিষ ছড়ায়, তখন তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়— ‘দরিদ্রনারায়ণের সেবা করাই পরম ধর্ম।’
১৮৯৩ সালের শিকাগো ধর্মমহাসভায় তাঁর মুখে ‘সিস্টারস অ্যান্ড ব্রাদারস অফ আমেরিকা’ শুধু করতালির ঝড়ই তোলে না, বদলে দেয় পাশ্চাত্যের চোখে প্রাচ্যের অবস্থান। তিনি জানান, ধর্ম মানে বিভেদ নয়— সহিষ্ণুতা, সৌহার্দ্য, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা। তাঁর বার্তা ছিল— ‘যতদিন একজন মানুষ ক্ষুধার্ত, ততদিন মন্দিরে ঈশ্বরের খোঁজ বৃথা।’
তাঁর ঈশ্বরচিন্তা ছিল মানবকেন্দ্রিক ও মুক্ত। তিনি বলতেন— ‘আমি সেই ঈশ্বরকে মানি না, যাকে একজন গরিবের দেহে দেখতে পাই না।’ মন্দিরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ঈশ্বরকে খুঁজে নিয়েছিলেন মানুষের মাঝে, সেবার মধ্য দিয়ে। ধর্ম আর ঈশ্বরের সংজ্ঞা তিনি নতুনভাবে গড়ে তুলেছিলেন— ভয়ের নয়, ভালোবাসার ভিত্তিতে।
তরুণসমাজকে ঘিরে ছিল তাঁর গভীর আস্থা। বলেছিলেন, ‘আমাকে ১০০ উদ্যমী তরুণ দাও, আমি ভারতকে বদলে দেব।’ তাঁর চোখে যুবক মানে কেবল বয়সে তরুণ নয়— মননেও জাগ্রত, সাহসী, দায়বদ্ধ। আজকের হতাশ যুবসমাজের কাছে এই বাণী যেন এক নবজাগরণের আহ্বান। আজও তাঁর জীবন আমাদের শেখায়— যে ঘরে সত্য, সাহস আর মানবিকতার পাঠ শেখানো হয়, সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক সন্ন্যাসী— মানবসেবায় ব্রতী সন্ন্যাসী। তাঁর আলো জ্বলছে— উত্তর থেকে দক্ষিণে, ঘর থেকে বিশ্বদরবারে। তাঁর শিক্ষা শুধু অতীতের স্মৃতি নয়— ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
(লেখক শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। তুফানগঞ্জের বাসিন্দা)



