রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার: ভোট এবার মোটেও উৎসব নয়, ওঁদের কাছে বর্তমানে রীতিমতো মূর্তিমান এক আতঙ্ক হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এসআইআর-এর কোপে ভোটাধিকার হারানো বহু মানুষের রাতের ঘুম উড়েছে। আতঙ্ক (Voter List Deletion Trauma) ওঁদের এতটাই গ্রাস করছে যে কেউ কেউ ট্রমার শিকার হয়ে পড়ছেন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে ট্রাইবিউনালে আবেদনের জন্য ছোটাছুটির পাশাপাশি অনেকেই ট্রমা সারাতে চিকিৎসকের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। ইটাহার (Itahar) সহ বিভিন্ন জায়গার ডিলিটেড ভোটাররা কেউ কেউ ডিটেনশন ক্যাম্পের ফোবিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলেও খবর। ওষুধ দিয়ে চিকিৎসকরা সাময়িকভাবে মানসিক সমস্যা মেটাচ্ছেন বটে, কিন্তু কী করলে তা সমূলে নিকেশ করা সম্ভব হবে সেই হদিস দিতে ব্যর্থ। তবে তাঁদের কেউ কেউ অবশ্য এই মানুষদের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়াচ্ছেন।
রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের জেনারেল মেডিসিন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হাফিজুর রহমানও তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে এমন ভূরিভূরি রোগীর উদাহরণ দিচ্ছেন, যাঁরা ভোটাধিকার হারানোর জন্য নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্কে ভুগছেন। হাফিজুরের কথায়, ‘আমার কাছে এমন বহু রোগী আসছেন, যাঁদের অন্য তেমন কোনও রোগ নেই। অথচ এসে বলছেন, ডাক্তারবাবু আমাকে বাঁচান, রাতে ঘুমাতে পারছি না। কিছুক্ষণ কথা বলার পর জানা যাচ্ছে, ভোটার লিস্ট থেকে তাঁর নাম বাদ পড়ে যাওয়াই ওই পেশেন্টের ঘুম উড়ে যাওয়ার কারণ।’
গত এক মাসে এমন বহু রোগীকে অ্যাংজাইটি ও আতঙ্ক কাটানোর জন্য ঘুমের ওষুধ পর্যন্ত দিতে হয়েছে বলে ওই চিকিৎসক জানান। তিনি বলেন, ‘আমার নিজের গ্রামেও এমন বহু মানুষ ট্রমার শিকার হয়েছেন। ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম বিচারাধীন বা একেবারে ডিলিট হয়ে যাওয়াই এর একমাত্র কারণ। চিকিৎসার পাশাপাশি ট্রাইবিউনালে আবেদনের জন্য তাঁদের নথিপত্রও আমি নিজে ঠিকঠাক গুছিয়ে দিচ্ছি।’
চিকিৎসক হাফিজুর রহমানের অভিজ্ঞতাই শুধু নয়, বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললেই সেই আতঙ্কেরই প্রতিধ্বনি। ইটাহারের মানাইনগর দক্ষিণ বুথে খসরা তালিকায় ৭৯২ জন মোট ভোটার ছিলেন। তার মধ্যে ৩২৫ জনই বিচারাধীন ছিলেন। বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের চূড়ান্ত ঝাড়াইবাছাইয়ের পর ১৪৪ জনের নাম বৈধ ভোটার হিসেবে পরিপূরক তালিকায় সংযোজিত হয়েছে। বাকি ১৮১ জনের নাম ডিলিটেড। ওই বুথের বাসিন্দা বছর পয়তাল্লিশের হাসাম আলি বলেন, ‘এর আগে কতবার ভোট দিয়েছি। আর এবার আমার নাম ভোটার তালিকা থেকে ডিলিট হয়ে গেল। এখন কী হবে বুঝতে পারছি না। আতঙ্কে ঘুম হচ্ছে না।’
একই গ্রামের মনসুরা বিবির কথায়, ‘রান্না-খাওয়া কোনও কিছুতেই মন বসছে না। ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ পড়ে গেল। এবার যদি দেশের নাগরিক হয়ে না থাকতে পারি, সবসময় এই ভয়ে কাঁপছি।’ কাপাসিয়া অঞ্চলের পশিনা বিবি বললেন, ‘আমার স্বামী সহ পরিবারের সব সদস্যের নাম আছে। শুধু আমার নামটাই ডিলিট। এখন আমাকে যদি অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তো পরিবার থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব।’
পশিনাদের মতো মানুষ এই জেলার পাশাপাশি গোটা উত্তরবঙ্গ সহ রাজ্যেই আছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় তাঁদের ভবিষ্যৎ কী তা কারও জানা নেই। এমনই একজনের কথায়, ‘এবার কী তাহলে আমাদের কাছ থেকে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ফেরত নিয়ে নেওয়া হবে? যদি তা হয়, তবে তো সরকারি সমস্ত সুযোগসুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।’ রাজ্য সরকারের অনুদান, ব্যাংকের কেওয়াইসি’র কী হবে কারও জানা নেই। এসব আশঙ্কা যতই মাথাচাড়া দিচ্ছে এই মানুষগুলি ততই বেশি করে অবসাদের শিকার হয়ে পড়ছেন।

