ভোট উৎসবের বদলে উত্তরবঙ্গজুড়ে এখন থমথমে, বারুদমাখা পরিবেশ। রাস্তাঘাটে বের হলে মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধ আসন্ন। সারি সারি সাঁজোয়া গাড়ি, অত্য়াধুনিক বুলেটপ্রুফ যুদ্ধযান, আর রাস্তায় টহলরত কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান, সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গ এখন আক্ষরিক অর্থেই এক নিশ্ছিদ্র সেনাছাউনিতে পরিণত হয়েছে।
শুভঙ্কর চক্রবর্তী


পিঠে বন্দুক, এক হাতে লম্বা ব্যাটন, অন্য হাতে লাঠিতে বাঁধা লাল পতাকা। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে দুই জওয়ান গলায় ঝোলানো বাঁশিতে অনবরত ফুঁ দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ যেন এক চুলও এগোতে না পারেন। উলটো দিক থেকে একের পর এক সাঁজোয়া গাড়ি ঢুকছে সিআরপিএফ ক্যাম্পে। মঙ্গলবার দুপুরে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ লাগোয়া রাস্তায় তখন যান চলাচল বন্ধ। ‘সাত, আট, নয়…’ পেট্রোল পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে সাঁজোয়া গাড়ি গুনছিলেন এক টোটোচালক। ‘স্যর, এখানে কি যুদ্ধ লাগবে নাকি?’ বিস্ময়ের সঙ্গে মাঝবয়সি যাত্রীকে প্রশ্ন করেন চালক। কথা থামে না তাঁর, ‘এই গাড়িগুলো তো টিভিতে দেখেছি। কাশ্মীরের ওদিকে চলে। সেনারা গাড়ির ভেতর থেকে গুলি করে।’ যাত্রী খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, ‘যুদ্ধ নয়, ওগুলো ভোটের জন্য আনা হয়েছে।’ ‘ভোটের জন্য?…’ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন চালক। তার আগেই জওয়ান পতাকা নাড়েন যান চলাচল শুরু হয়।
ভোট (WB Election 2026) না যুদ্ধ- এই প্রশ্ন শুধু ওই টোটোচালকের নয়, দিনহাটা থেকে কালিয়াচক সর্বত্রই তা সাধারণ মানুষের মনে ঘুরছে। এরমধ্যেই মঙ্গলবার থেকে মোটরবাইক চালানোয় লাগাম টানার নজিরবিহীন নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তা নিয়ে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই উঠেছে নানা প্রশ্ন। কমিশনের নির্দেশ অনুসারে জরুরি পরিস্থিতি বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগদান, চিকিৎসা পরিষেবার মতন বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত মোটরবাইক চলাচলে কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কমিশন। সেকথা শোনার পর ক্ষোভ চেপে রাখেননি শিলিগুড়ির প্রবীর দাস। সত্তরোর্ধ্ব প্রবীর প্রাক্তন সরকারি কর্মী। তাঁর কথা, ‘বাংলায় ভোটে সন্ত্রাস হয় এটা ঠিক। তবে সব জায়গায় তো হয় না। শিলিগুড়ির মতো শান্তিতে ভোট অনেক জায়গাতেই হয়। তাহলে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না। বাইক না চালানোর যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা শুনে মনে হচ্ছে বাংলায় জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে।’ এক লাইনে অনেকের মনের কথা বলে দিলেন মালদার ৪২০ মোড়ের ফল বিক্রেতা, ‘আমরা শান্তি চাই, তবে আতঙ্ক নয়। যেভাবে আধাসামরিক বাহিনী তৎপর হয়েছে তাতে এখন ভয় হচ্ছে। এতটাও দরকার ছিল না।’
ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই ক্রমশ বদলাতে শুরু করেছিল উত্তরবঙ্গের (North Bengal News) চেনা ছবিটা। পাড়ায় পাড়ায় দেওয়াল লিখন বা মাইকের প্রচারের চেয়েও মানুষের নজর বেশি কেড়েছে একের পর এক স্পেশাল ট্রেনে করে আসা ভিনরাজ্যের সশস্ত্র জওয়ানদের আগমন। শহরের রাজপথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামবাংলার আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, সর্বত্রই এখন জলপাই আর খাকি উর্দিধারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ‘উত্তেজনাপ্রবণ’ এলাকাগুলোতে টহল দিচ্ছে ভারী সাঁজোয়া গাড়ি বা আর্মার্ড ভেহিকল, যা দেখে সাধারণ মানুষও চমকে উঠছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর তাণ্ডবে কার্যত লন্ডভন্ড হয়েছে আলিপুরদুয়ার শহর, অথচ রাজনৈতিক উত্তাপ যেন হার মানিয়েছে প্রকৃতির সেই খামখেয়ালি রুদ্ররূপকেও। ভোট উৎসবের বদলে উত্তরবঙ্গজুড়ে এখন থমথমে, বারুদমাখা পরিবেশ। রাস্তাঘাটে বের হলে মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধ আসন্ন। আর তারই চূড়ান্ত মহড়া দিতে ব্যস্ত প্রশাসন। সারি সারি সাঁজোয়া গাড়ি, অত্যাধুনিক বুলেট প্রুফ যুদ্ধ যান, আর রাস্তায় টহলরত কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান (Central Forces), সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গ এখন আক্ষরিক অর্থেই এক নিশ্ছিদ্র সেনাছাউনিতে পরিণত হয়েছে।
এই বিপুল সামরিক উপস্থিতি আর নিয়মের কড়াকড়ি বাংলার ভোট ছবিতে নতুন রং ছড়িয়েছে। যে গ্রামের পুকুরপাড়ে বা বটতলায় বসে একসময় মানুষ চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে রাজনীতির তর্ক জুড়ে দিত, সেই জায়গাগুলোর বেশিরভাগই আপাতত ফাঁকা। সেখানে এখন হাতে অত্যাধুনিক ইনসাস বা একে ৪৭ রাইফেল নিয়ে কড়া পাহারায় দাঁড়িয়ে আছেন জওয়ানরা। সব মিলিয়ে সেই যুদ্ধং দেহি আবহ। সুজাপুরের জালালপুর গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরের উলটোদিকের পুকুরপাড়ের চায়ের দোকানে আর খদ্দের আসছে না। কেন আসছে না? দোকানদার আসরাফুল হকের কথা, ‘দোকানের সামনে জটলা করা যাবে না বলে মিলিটারি এসে শাসিয়ে গিয়েছে। তাই ভয়ে সেভাবে কেউ আসে না।’
তবে এই বেনজির নিরাপত্তার একটি অন্ধকার প্রেক্ষাপটও রয়েছে। এই রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে ভোট পরবর্তী বা ভোট পূর্ববর্তী হিংসার রক্তাক্ত দলিল। বুথ দখল, বোমাবাজি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির যে কালো ছায়া প্রতিটি নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তাকে সমূলে উৎপাটন করতেই নির্বাচন কমিশনের এই মরিয়া ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন অনেকেই। লক্ষাধিক জওয়ানের এই বিপুল বহর দিয়ে প্রশাসন চাইছে, কোনওভাবেই যেন বাহুবল বা পেশিশক্তি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে নিতে না পারে। সোমবার সন্ধ্যায় কোচবিহারের জেলা শাসকের দপ্তরে বৈঠক শেষে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সিইও মনোজ আগরওয়াল এমনটাই দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘সাধারণ ভোটারদের আপৎকালীন সুরক্ষার জন্য চষে বেড়াচ্ছে কুইক রেসপন্স টিম বা কিউআরটি। তাতে ভয় বা আতঙ্কের কিছু নেই।’
আসলে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস আর ক্ষমতাদখলের মরিয়া লড়াই সাধারণ মানুষকে এমন এক পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তাঁদের মনে হচ্ছে তাঁরা যেন কোনও রণাঙ্গনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। দু’দিন আগেও যেখানে শাসক ও বিরোধী দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক তর্জা জমত, সেই চায়ের দোকানে এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়াকড়ি আর মোটরবাইক নিয়ে বেরোনোর নিষেধাজ্ঞার খুঁটিনাটি নিয়ে। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ ভোটারদের মনে একদিকে যেমন নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে এক অজানা আতঙ্কেরও জন্ম দিচ্ছে। তবে দিনের শেষে সমস্ত শঙ্কার ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষ মূলত শান্তিই চায়। শিলিগুড়ির বাগরাকোটে চায়ে চুমুক দিয়ে সেকথাই বললেন রায়গঞ্জ থেকে শহরে রিকশা চালাতে আসা বিষ্ণু রায়, ‘আরে আমরা হইলাম গরিব মানুষ, আমাগো আবার পাট্টিসাট্টি কীসের। শান্তিতে ভোট দিতে পাইলেই হইল।’

