ভারতে সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ বিরল নয় ঠিকই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের মুখে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের এই বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশ প্রাথমিক দৃষ্টিতে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।
তবে বাস্তবে সেই স্বস্তি টিকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটের দু’দিন আগে পর্যন্ত ট্রাইবিউনাল যাঁদের আবেদনে সাড়া দিয়ে ছাড়পত্র দেবে, নির্বাচন কমিশন তাঁদের নাম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবে। অর্থাৎ প্রথম দফার জন্য ২১ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফার জন্য ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত এই জানলা খোলা থাকছে।
কিন্তু সময়ের স্বল্পতা এবং কাজের বিশালত্ব বিচার করলে এই নির্দেশের প্রকৃত বাস্তবায়নে গভীর অনিশ্চয়তার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইকোর্ট গঠিত ১৯টি ট্রাইবিউনালের পক্ষে এই সামান্য কয়েকদিনের মধ্যে ২৭ লক্ষ আবেদন খতিয়ে দেখে নিষ্পত্তি করা বিরাট চাপ। এতে ট্রাইবিউনালের ওপর যে পরিমাণ চাপ পড়বে, তাতে প্রত্যেক আবেদনকারীর নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা যাবে কি না, তাও বিরাট প্রশ্ন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তি এলেও বিচার প্রক্রিয়ার গুণগত মান বজায় রেখে প্রত্যেকের আবেদনের নিষ্পত্তি করা তাই বিরাট চ্যালেঞ্জ। যাঁরা শেষমেশ ট্রাইবিউনালের সবুজ সংকেত পাবেন, তাঁদের নাম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তুলে ভোটার স্লিপ সংশ্লিষ্টদের বাড়িতে পাঠাতেও হিমসিম খাবে নির্বাচন কমিশন। এর আগে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করতে মাঝরাত পার করে ফেলেছে কমিশন। সেক্ষেত্রেও হয়রানি হয়েছিল সাধারণ মানুষের।
ফলে শীর্ষ আদালতের নির্দেশে নাম তোলা এক বিষয়, আর সেই নাম ধরে ধরে বুথে পৌঁছে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে হাজার হাজার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে সেই সংশোধিত তালিকা ছাপিয়ে নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া এবং সেই অনুযায়ী ভোটার স্লিপ বিলি সময়সাপেক্ষ।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশকে নিজের নৈতিক জয় বলে প্রচার করছেন। তিনি ভোটাধিকার হারানোদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের সমর্থন আদায়ের ছক কষছেন। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে বাতিলদের মধ্যে কারা শেষমেশ ভোট দিতে পারবেন, সেটা ভোটের মাত্র দু’দিন আগে নিখুঁতভাবে ঠিক করা নিয়ে সংশয় আছে।
বহু মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে এই টানাপোড়েনের মূলে আছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে বাংলার লক্ষ লক্ষ ভোটারের নামে নির্বাচন কমিশনের কাঁচি চালানো। নাগরিকদের বিধিবদ্ধ অধিকারের ওপর কমিশনের এই বুলডোজার চালানোও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) মতো রুটিন প্রক্রিয়া ধীরেসুস্থে সুষ্ঠুভাবে না করে এমন তাড়াহুড়ো করার দরকার নিয়েও প্রশ্ন আছে।
কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সমস্ত নথিপত্র পেশ করেও অনেক নাগরিককে চরম হেনস্তা হতে হয়েছে। শেষপর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এবং বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ভারতের নাগরিকদের ভোটাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করার চেষ্টা করতে হয়েছে। শীর্ষ আদালত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেয়েছে নাগরিকদের অধিকার যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সেই সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের কাঁধে। সময়ের অতি সংক্ষিপ্ত পরিসরে প্রশাসনিক তৎপরতা যদি বিচারবিভাগীয় সদিচ্ছার সমান্তরালে না চলে, তবে ২৭ লক্ষ মানুষের এই তথাকথিত স্বস্তি শেষপর্যন্ত দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হতে পারে। মানুষকে ভোটমুখো করতে গিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে সাধারণ নাগরিকরা ট্রাইবিউনালের লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তীর্থের কাকের মতো। প্রবল গরম আর একরাশ উৎকণ্ঠাকে সঙ্গী করে লক্ষ লক্ষ নাগরিক ফের এখন ধৈর্যের পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে।



