দীপ সাহা
চার দশকেরও বেশি দীর্ঘ ও বর্ণময় রাজনৈতিক জীবন। বিরোধী নেত্রী হিসেবে সামলেছেন বহু ঝড়ঝাপটা। নেতৃত্ব দিয়েছেন একাধিক আন্দোলনে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আরও কত কী! এই বাংলা তাঁকে চিনেছে ‘ফায়ার ব্র্যান্ড লিডার’ হিসেবেই। তৃণমূলের একনিষ্ঠ সৈনিকরা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘অগ্নিকন্যা’। সেই ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই নাকি এবারের ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে অগ্নিপরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। অন্তত বাংলার রাজনৈতিক হিসেবনিকেশ সেই আভাসই দিচ্ছে।
এক হাতে দামি স্মার্টওয়াচ, আরেক হাতে হেলথ ব্যান্ড। বাহু শীর্ণ হয়ে এসেছে অনেকটাই। মুখের বলিরেখাও স্পষ্ট। সঙ্গে চোখেমুখের উদ্বেগও। বাংলায় দু’দফায় ভোট ঘোষণা হতেই এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী। কিন্তু হাবভাবে-কথাবার্তায় চেনা ঝাঁঝটা উধাও। উত্তরের এক দাপুটে তৃণমূল নেতার কথায়, ‘এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই, একুশের ভোটেও নেত্রীর মুখ চেয়ে বহু মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছেন। এবার সেই ক্যারিশমাটা দেখতে পাচ্ছি না।’
উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে বেসরকারি জনমত সমীক্ষায়। একদিকে, দীর্ঘ পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস, অন্যদিকে বাংলা জয়ে মরিয়া বিজেপি- দুইয়ের লক্ষ্য একটাই নবান্ন। আর সেই লড়াই যে এবার একপেশে নয়, সেই ইঙ্গিত মিলছে ‘ম্যাট্রিজ’-এর মতো সংস্থার সমীক্ষায়।
সংস্থাটির সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, এবারের হাই ভোল্টেজ নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও, বিজেপি একেবারে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। হিসেব বলছে, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ৪৩ শতাংশ ভোট, আর অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের ঝুলিতে যেতে পারে ৪১ শতাংশ। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভাগে থাকতে পারে ১৬ শতাংশ ভোট। মাত্র ২ শতাংশ ভোটের এই সামান্য ব্যবধানই স্পষ্ট করে দেয় যে, লড়াই এবার কতটা কঠিন। আসন সংখ্যার নিরিখে ম্যাট্রিজের পূর্বাভাস আরও চমকপ্রদ। সমীক্ষা বলছে, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ১৪০ থেকে ১৬০টি আসন। অন্যদিকে, বিজেপি পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৫০টি আসন। অন্যদের দখলে যেতে পারে ৮ থেকে ১৬টি আসন। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্ট যে, তৃণমূল ম্যাজিক ফিগার ছুঁয়ে ফেললেও মমতাকে স্বস্তিতে সরকার গড়তে দেবে না গেরুয়া শিবির।
এটা ঠিক যে, জনমত সমীক্ষার ফল যে সবসময় ভোটবাক্সে প্রভাবিত হয়, তা নয়। কিন্তু শাসক বা বিরোধী উভয়েরই রক্তচাপ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তা যথেষ্ট।
এমনিতেই একুশের ভোটে সরকার গড়তে না পারার আক্ষেপ এখনও যায়নি বিজেপি নেতাদের। ফলে এবার সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন দিল্লির নেতারা। যে কোনওভাবে বঙ্গ দখল করাই টার্গেট তাঁদের। ফলে সমীক্ষার ফল যদি বাস্তবে পরিণত হয়, তবে অন্য রাজ্যের মতো এরাজ্যেও ঘোড়া কেনাবেচা চলবে, একথা হলফ করে বলাই যায়। আর এখানেই উদ্বেগ বাড়ছে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের।
দীর্ঘ পনেরো বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার ফলে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ তৈরি হয়, তা সামাল দেওয়া যে কোনও শাসকদলের পক্ষেই এমনিতে পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগে বামেদের ৩৪ বছরের দুর্ভেদ্য শক্ত দুর্গে ফাটল ধরিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তখন লড়াইটা ছিল ক্ষমতা দখলের। কিন্তু ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার তাঁকে লড়তে হচ্ছে নিজের দলের অন্দরের কিছু ক্ষোভ, দীর্ঘদিনের শাসনে জন্ম নেওয়া প্রশাসনিক ক্লান্তি এবং বিরোধীদের অতি-আক্রমণাত্মক প্রচারের বিরুদ্ধে। শিক্ষক থেকে পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি, র্যাশনের মতো কেলেঙ্কারি এবং একাধিক স্থানীয় স্তরের অস্বস্তিকর ঘটনা রাজ্যের শাসকদলের প্রতি সাধারণ মানুষের একাংশের মোহভঙ্গ ঘটিয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের। সেইসঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ায় তৃণমূলের ঘরেই সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোট ভাগ নিয়েও শাসক শিবিরে চিন্তার উদ্রেক রয়েছে। বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে। এতদিনে বিজেপি বিরোধী যে ভোটে তৃণমূলের একচেটিয়া অধিকার ছিল, সেটা এখন অনেকটাই স্তিমিত। কংগ্রেস, হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, ওয়াইসির মিম কিংবা আইএসএফ-এর দিকে যদি মুসলিম ভোটের সামান্য অংশও ঘুরে যায়, তাহলে তাও তৃণমূলের জয়ে বড়সড়ো বাধা তৈরি করতে পারে। মুসলিমদের অনেকেই বলছেন, এতদিন তো তৃণমূলকে ভোট দিলাম। তাতে আমাদের আর উন্নয়ন হল কোথায়! এই যে জনরোষ, সেটাও বেশ আঁচ করতে পারছেন মমতা।
বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবারের বঙ্গ-ভোটকে আক্ষরিক অর্থেই পাখির চোখ করেছে। প্রচারের মূল অভিমুখই হতে চলেছে ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলা’ এবং ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর সুবিধা। রাজ্যে শিল্প আনা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মহিলাদের সার্বিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলিকে তুলে ধরে তাঁরা বাংলার মানুষের মন জয় করতে চাইছেন। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার রাজ্য বিজেপি সাংগঠনিকভাবে অনেক বেশি সতর্ক।
ফলে আপাতদৃষ্টিতে শাসকদল বাইরে থেকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী চেহারা বজায় রাখলেও, দলের অন্দরে কিন্তু এক অদ্ভুত স্নায়ুর চাপ এবং উদ্বেগের চোরাস্রোত বয়ে চলেছে। রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, মমতা কি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে চলেছেন?
চলতি মাসের এই হাই ভোল্টেজ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এমন বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতার গলাতেও একান্ত আলাপচারিতায় দলের চূড়ান্ত আসন সংখ্যা নিয়ে গভীর ‘উদ্বেগ’ ধরা পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাসকদলের এক প্রার্থীর কথায়, ‘দলের ভেতরে যথেষ্ট চাপ রয়েছে। এসআইআর নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। দল ২২৬টি আসনে জয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিলেও তা অর্জন করা বেশ কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।’
প্রথম দফার নির্বাচনের আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েক বাকি। ২৩ এপ্রিল ভোটগ্রহণ। কিন্তু তার আগে ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ৩৫ লক্ষ ৯৭ হাজার ৭০৪ জন ভোটারের ভবিষ্যৎ ঝুলে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন তালিকায়। এর মধ্যে ঠিক কত শতাংশ ভোটার শেষপর্যন্ত ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন, সেই অঙ্কটি এখনও কারও কাছে স্পষ্ট নয়। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কাই এখন শাসকদলের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
সংখ্যালঘু অধ্যুষিত উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখর বিধানসভার কথাই ধরা যাক। এই কেন্দ্রটিতে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা ৭৮,৪৭৫। অবাক করার মতো বিষয় হল, এই সংখ্যাটি বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ার মতো বড় এবং উল্লেখযোগ্য আদিবাসী জনসংখ্যা বিশিষ্ট দুটি জেলার মোট বিচারাধীন ভোটারের মিলিত সংখ্যার (৭২,৬৯৪ জন) চেয়েও বেশি। এই পরিসংখ্যানগত অসামঞ্জস্য স্বাভাবিকভাবেই শাসকদলের নেতাদের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
ব্যারাকপুরের তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক, যিনি ইতিমধ্যেই কলকাতায় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে তাঁর দল এবার কোনও বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং সরাসরি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেই লড়াই করছে।
বাংলার বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী এবার দলের জন্য ২২৬টি আসনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছেন। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও বারবার জোর দিয়ে বলছেন যে তৃণমূল কংগ্রেস ফের ক্ষমতায় ফিরবে। কিন্তু নির্বাচনি পাটিগণিতের হিসেব বলছে অন্য কথা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এমন ৫৫টি আসন ছিল যেখানে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ১৫,০০০ ভোটের কম। এর মধ্যে ৩৯টি আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল ১০,০০০-এরও নীচে। এই আসনগুলির যে কোনওটিতে যদি শাসকদলের বিরুদ্ধে সামান্যতম ভোটের মেরুকরণ হয়, তবে তৃণমূলের আসন সংখ্যা অনেকটাই নীচে নেমে আসতে পারে। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যে সমস্ত আসনে তৃণমূল ৫০,০০০ থেকে ১ লক্ষ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জিতেছিল, সেখানে যদি ব্যাপক হারে ভোটারের নামও বাদ যায়, তাহলে হয়তো জয়ের ব্যবধান কমবে, কিন্তু তৃণমূলের জয় আটকাবে না।
গত কয়েক বছর ধরেই উত্তরবঙ্গের আটটি জেলা বিজেপির অত্যন্ত উর্বর রাজনৈতিক জমি। ২০১৯-এর লোকসভা থেকে শুরু করে একুশের বিধানসভা- বারবার উত্তরবঙ্গ দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছে পদ্ম শিবিরকে। জনমত সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে বেশিরভাগ আসনেই বিজেপি তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে পারে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসও এবার এক ইঞ্চি জমি বিনা যুদ্ধে ছাড়তে নারাজ। শাসকদল বিলক্ষণ জানে, দক্ষিণবঙ্গের আসন দিয়ে ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে গেলে উত্তরবঙ্গের অন্তত আংশিক সমর্থন ছাড়া তা কার্যত অসম্ভব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাট্রিজের সমীক্ষায় দেখানো ২ শতাংশের সামান্য ব্যবধানই হতে পারে এবারের নির্বাচনের আসল ‘গেম চেঞ্জার’। শেষমুহূর্তের প্রচার, সামান্য সুইং ভোট বা ভোটারদের মনবদলের উপর নির্ভর করে চূড়ান্ত ফলাফল যে কোনও দিকেই ঘুরে যেতে পারে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এই সমীক্ষার ফল অবশ্য কড়া সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যে এক ঐতিহাসিক ও স্নায়ুক্ষয়ী রাজনৈতিক যুদ্ধ হতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শেষপর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দুর্গ অটুট রাখতে পারবেন, নাকি বিজেপি বাংলায় নতুন সমীকরণ তৈরি করবে, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ৪ মে পর্যন্ত। তবে এটুকু নিশ্চিত, বাংলার মানুষ এক চরম প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক দ্বৈরথের সাক্ষী হতে চলেছেন।

