অর্থনীতিতে ধাক্কা

শেষ আপডেট:

বিধানসভা ভোটের বৈতরণি পেরোতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার জনমোহিনী ভোট অন অ্যাকাউন্ট পেশ করেছে। দানখয়রাতির রাজনীতি এখন শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, ভারতে সমর্থন আদায়ের সবথেকে সহজ ও মোক্ষম পন্থা। বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, আশাকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা, পার্শ্বশিক্ষক, সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রামীণ পুলিশের ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব সেই পন্থারই অঙ্গ।

ভোট অন অ্যাকাউন্টে নতুন সংযোজন অবশ্য যুবসাথী নামে নতুন প্রকল্প। যাতে কর্মহীন ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি তরুণদের দেড় হাজার টাকা মাসিক ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব আছে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের হাতে নগদ পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগকেই জনকল্যাণমূলক বলা হয়। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় স্পষ্ট, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা লাডলি বহিন যোজনার মতো প্রকল্পগুলিতে বিনা শর্তে মহিলাদের হাতে নগদ টাকা তুলে দেওয়ায় রাজ্যগুলির কোষাগার ক্রমশ দেউলিয়া হচ্ছে।

এই বিপদের পাশাপাশি পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের রাস্তাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে ওই সমীক্ষায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। সেসম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও বাজেটে ভোটের গন্ধমাখা ভাতা ঘোষণায় স্পষ্ট, রাজ্যের আর্থিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই অসুখ শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, সংক্রামক ব্যাধির মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা- সর্বত্র ঢালাও ভাতার প্রতিশ্রুতি। উত্তর থেকে দক্ষিণ, রাজনৈতিক আদর্শ নির্বিশেষে জনসমর্থন পাওয়া সুনিশ্চিত করতে সরকারি কোষাগার উজাড় করে দেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা ভারতের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ভোটের তাগিদে দলগুলো ভুলে যাচ্ছে, রাজকোষে আসলে করদাতার কষ্টার্জিত অর্থ থাকে। সেটা দলীয় বা ব্যক্তিগত তহবিল নয়।

পশ্চিমবঙ্গে সরকারের ঘাড়ে ঋণের বোঝা পাহাড়প্রমাণ বলে এই সংকট আরও গভীর। ভাতাবৃদ্ধির ফলে খরচ বাড়লে পাল্লা দিয়ে ঋণের বোঝা বাড়তে বাধ্য। সামনে বিধানসভা ভোট বলে নতুন কর্মসংস্থানের বদলে বেকার ভাতার মোড়কে তরুণ প্রজন্মকে শান্ত রাখার চেষ্টা হচ্ছে। মহিলা ভোটব্যাংক তথা গ্রামকে খুশি করার চেষ্টা তো আছেই।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা যুবসাথীর মতো প্রকল্প গ্রামীণ অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তি আনতে পারলেও আদতে তা মেধা ও শ্রমকে উৎপাদনশীল কাজে না লাগিয়ে ভোট নিশ্চিত করার রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। রাজ্য সরকার এই বিপুল অর্থ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বা কলকারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করলে আগামী প্রজন্ম স্বাবলম্বী হওয়ার পথ পেত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় বঞ্চনা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার সামাজিক প্রকল্পে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। রাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর স্বাভাবিক অভিযোগ, ভাতা দিয়ে ভোট কিনতে চাইছে শাসকদল। তবে তাঁরাও ক্ষমতায় এলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে তিন হাজার টাকা ভাতার আগাম ঘোষণা করে রাখলেন। ভাতার রাজনীতি রইলই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন, বড় শিল্প বা পরিকাঠামোর সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগে, কিন্তু অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা ঢুকে যাওয়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব আছে।

ভাতা দিয়ে পকেট ভরানোর কৌশল নির্বাচনের ঠিক আগে শাসকদলের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন তৈরি করতে পারে। বিজেপি যেখানে হিন্দুত্ব, অনুপ্রবেশের মতো বিষয়গুলিকে হাতিয়ার করে এগোতে চাইছে, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সমস্যাকে ভাতার মোড়কে ঢেকে দিতে চাইছেন। তৃণমূল নেত্রী এব্যাপারে বিজেপির চেয়ে কয়েক কদম এগিয়ে থাকছেন এই কারণে যে, তিনি শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না, ভাতায় সরকারি সিলমোহর লাগিয়ে দিচ্ছেন।

লড়াইটা আর তাই নীতি-আদর্শের নয়, বরং কে কত বেশি খয়রাতি দিতে পারে, তার প্রতিযোগিতার। দাক্ষিণ্যের লড়াইয়ে পরাজিত হচ্ছে বাংলার অর্থনীতি। ভাতার চাল হয়তো তৃণমূলকে ভোটে মাইলেজ দেবে। কিন্তু তা পশ্চিমবঙ্গের কোষাগার রক্তশূন্য হওয়ার বিনিময়ে।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

চাপের নতুন ফ্রন্ট

দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে, চাপের মুখে বাংলায় নিজেদের...

নজিরবিহীন

জাতির উদ্দেশে ভাষণের ঐতিহাসিক পরম্পরায় বিরাট ধাক্কা লাগল সন্দেহ...

স্বস্তিতেও প্রশ্ন

ভারতে সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ বিরল নয় ঠিকই।...

ভোটের ভাষ্য

প্রতিশ্রুতি ছাপিয়ে প্রহারের বয়ান। রাজনৈতিক নয়, ভোটের ভাষ্য হয়ে...