তন্ময় সিংহ
নব্বইয়ের দশকের ফুটবল ময়দানে কিংবদন্তি কোচ অমল দত্ত প্রবর্তিত ‘ডায়মন্ড সিস্টেম’ আজও ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে এক রোমাঞ্চকর স্মৃতি। ১৯৯৭-এর সেই ঐতিহাসিক ডার্বিতে পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশিক্ষণাধীন ইস্টবেঙ্গল যেভাবে বাইচুং ভুটিয়ার হ্যাটট্রিকে ডায়মন্ড সিস্টেমকে ৪-১ ফলে চূর্ণ করেছিল, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সেই ফুটবলীয় লড়াইকেই ফিরিয়ে এনেছেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। শাসকদলের মতে, এবারের লড়াই আসলে বিজেপির সাজানো ‘ডায়মন্ড সিস্টেম’ বনাম তৃণমূলের ‘মেসি’ অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা। মাঠের ফুটবল ম্যাচের মতো এবারের নির্বাচনও স্বাধীনতার পরবর্তীকালে সর্বাধিক মানুষের অংশগ্রহণে এক রেকর্ড ভাঙা মুহূর্ত হতে চলেছে, যেখানে চতুর্থবারের মতো বিজয়ী শিরোপা ছিনিয়ে নিতে মরিয়া ঘাসফুল শিবির।
২০২৬-এর এই নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই। তবে এসআইআর–এর জেরে কয়েক লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার হারানো নিয়ে জনমানসে প্রবল উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত বড় কোনও হিংসা ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, তবুও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির অতি-সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মূলত দুই যুযুধান পক্ষের এই হাই ভোল্টেজ ম্যাচে সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা আর ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই সমান্তরালভাবে প্রবহমান।
বিজেপির ‘ডায়মন্ড সিস্টেম’-এ প্রধান ফরওয়ার্ড বা চিমা ওকোরির ভূমিকায় অবতীর্ণ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাঙালি আবেগ আর মৎস্য-সংস্কৃতিকে সঙ্গী করে তিনি এবার মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকছেন। এই সিস্টেমে মাঝমাঠের দখল নিয়েছে ইডি, সিবিআই ও নির্বাচন কমিশনের মতো সংস্থাগুলি, যাদের ভূমিকা নিয়ে শাসকদলের তরফে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিজেপির রক্ষণে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব সামলাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা এবং যোগী আদিত্যনাথ বা হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো হিন্দুত্বের আইকনরা। আর গোলরক্ষকের বিশ্বস্ত গ্লাভস হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, যিনি একাই বিজেপির বঙ্গীয় মুখ হিসেবে নিজের দাবি সুনিশ্চিত করেছেন।
পালটা লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের রক্ষণভাগকে মজবুত করেছে ‘ডোল’ রাজনীতির শক্তিশালী ব্যূহ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা আবাস যোজনার মতো প্রকল্পগুলি এখানে পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই দুর্ভেদ্য রক্ষণের মতো কাজ করছে। দলের তাত্ত্বিক ভরকেন্দ্র ‘আইপ্যাক’-এর ওপর কেন্দ্রীয় সংস্থার আঘাত আসার পর গোলরক্ষকের গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মাঝমাঠে সায়নী ঘোষের মতো যুব নেত্রীদের জনপ্রিয়তা এবং রাজ্যের নারী ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক তৃণমূলের অন্যতম চালিকাশক্তি। এছাড়া সংগঠনের মজবুত বুথ ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা তাদের বিজেপির তুলনায় এগিয়ে রাখছে। আক্রমণে ফরওয়ার্ড লাইনে দেবের মতো সুপারস্টার এবং মহুয়া মৈত্র বা ইউসুফ পাঠানের মতো বাগ্মী সাংসদদের উপস্থিতি শাসক শিবিরকে আলাদা অক্সিজেন দিচ্ছে।
শেষপর্যন্ত সব আলোচনা গিয়ে থামছে সেই ‘মেসি ফ্যাক্টর’-এই। সত্তরের গণ্ডি পেরিয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে ২৯৪টি আসনে একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তা বিরোধীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। দুর্নীতি বা অপশাসনের অভিযোগের মুখেও তাঁর ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তিই তৃণমূলের প্রধান রক্ষাকবচ। বিজেপি এবার মেসি-ম্যাজিক রুখতে মৌনব্রত পালন করলেও, সাধারণ মানুষের আস্থাই শেষ কথা বলবে। অমল দত্তর সেই অপরাজেয় ডায়মন্ড সিস্টেম কি এবারও বাইচুং-সুলভ কোনও ম্যাজিকে পরাস্ত হবে, নাকি ইতিহাসের চাকা অন্য পথে ঘুরবে- তার চূড়ান্ত উত্তর পেতে এখন কেবল কয়েকদিনের অপেক্ষা।
(লেখক জনমত সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত।)



