জয়জিৎ বণিক
প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী একবার তাঁর সহকর্মীদের কাছে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, গোটা দেশে ভারতীয় জনতা পার্টি যখন একটু একটু করে নিজেদের জমি শক্ত করছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে তাদের থমকে থাকাটা তাঁর কাছে কতটা যন্ত্রণাদায়ক। বাজপেয়ীর সেই আক্ষেপের নেপথ্যে একটি গভীর ঐতিহাসিক কারণ ছিল। যে মানুষটি ১৯৫১ সালে বিজেপির পূর্বসূরি ‘ভারতীয় জনসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নিজের রাজ্য ছিল এই বাংলা। শুধু তাই নয়, যে বাজপেয়ী পরবর্তীকালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়িই হয়েছিল জনসংঘের একেবারে শুরুর দিনগুলোতে শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে। অথচ সেই বাংলার মাটিতেই দশকের পর দশক ধরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে কার্যত ব্রাত্য হয়ে থাকতে হয়েছিল। আজ, প্রচারের কানফাটানো কোলাহল স্তিমিত। চূড়ান্ত দফার ভোটের পর বাংলা এখন ফলাফলের অপেক্ষায়। রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা- বিজেপি হয়তো বাংলায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এবার তারা ক্ষমতার মসনদে বসতে পারুক বা না পারুক, বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সবাই মানছে, ২০২১ সালের ফলের চেয়ে এবার গেরুয়া শিবিরের গ্রাফ অনেকটাই ঊর্ধ্বমুখী হতে চলেছে।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুম- সর্বত্র এখন একটাই প্রশ্ন : ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কি আসলে ২০০৬ সালের পুনরাবৃত্তি, নাকি ২০১১ সালের? এই প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক চরম নাটকীয় অধ্যায়। ২০০৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেছিলেন বামফ্রন্টকে হারানোর একটা বড় সুযোগ তাঁর সামনে এসেছে। কিন্তু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেই বছর বামফ্রন্টকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয় এনে দিয়েছিলেন, আসন সংখ্যা পৌঁছেছিল ২৩৫-এ। দেখে মনে হয়েছিল, এই দুর্ভেদ্য লাল দুর্গ ভাঙা বুঝি অসম্ভব। কিন্তু রাজনীতির চিত্রনাট্য বদলাতে সময় লাগে না। সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন মমতার হাতে সেই বহুকাঙ্ক্ষিত ব্রহ্মাস্ত্র তুলে দিয়েছিল, যার ওপর ভর করে ঠিক পাঁচ বছর পর বাংলার বুক থেকে বামেদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন তিনি। আজ অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তৃণমূলের বর্তমান অবস্থান কি ২০০৬ সালের বামেদের মতো? যেখানে তাদের বাইরে থেকে অপ্রতিরোধ্য দেখালেও ভেতরে ভেতরে জনরোষের লাভা জমছে? নাকি এটা সত্যিই ২০১১, যেখানে পালাবদল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা?
বাজপেয়ীর সেই অধরা স্বপ্নকে ছুঁতে বিজেপি গত কয়েক বছরে বাংলার মাটিতে কালঘাম ছুটিয়েছে। পাঁচ সদস্যের ‘মণ্ডল শক্তি কেন্দ্র’ তৈরি করে একেবারে বুথ স্তরে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করার চেষ্টা করেছে তারা। যদিও অনেকেই মনে করেন, তৃণমূলের বিশাল এবং নিখুঁত মেশিনারির সামনে বিজেপির সংগঠন এবারও বেশ কিছুটা নড়বড়ে ছিল। কিন্তু বিজেপির সবচেয়ে বড় অস্ত্র এবার তাদের নিজস্ব সংগঠন নয়, বরং রাজ্যজুড়ে শাসকদলের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত হওয়া প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। শহর থেকে গ্রাম, ধনী থেকে দরিদ্র- সর্বত্রই রাজ্যের বেহাল কর্মসংস্থান নিয়ে এক গভীর হতাশা এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের তুরুপের তাস ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো সরাসরি নগদ অনুদান প্রকল্প গ্রামের মহিলাদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয় হলেও, এখন সেই সন্তুষ্টির দেওয়ালে ফাটল ধরাতে মরিয়া বিজেপি। এক গৃহবধূর আক্ষেপ, ‘মাসে ১৫০০ টাকায় আমার কী হবে? আমার মেয়ের একটা চাকরি দরকার, যাতে সে অন্তত ২০ হাজার টাকা রোজগার করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।’ এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে যে, অনুদানের রাজনীতি একটা পর্যায় পর্যন্ত ভোট টানতে পারলেও, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে তা কোনওভাবেই মেটাতে পারে না। কর্মসংস্থানের অভাব বা শিল্পায়নে ব্যর্থতা এবারের নির্বাচনে শাসকদলের মাথাব্যথার বড় কারণ।
এর পাশাপাশি শাসকদলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের আরও একটি বড় কারণ হল তৃণমূলের তৈরি করা এক অঘোষিত ‘সিস্টেম’। পাড়ার মোড়ের ক্লাব থেকে শুরু করে তৃণমূল স্তরের তরুণদের নিয়ে তৈরি এই সিস্টেম কার্যত প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কেউ নিজের বাড়ি মেরামত করতে চাইলে এই সিস্টেমের ঠিকাদারদের থেকেই মালপত্র কিনতে হবে, কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চাইলে এদের কমিশন দিতে হবে, এমনকি ভোটের দিন কে বুথে যাবে আর কে যাবে না, সেটাও এতদিন নির্ধারণ করে দিত এই স্থানীয় দাদারা। এই সিন্ডিকেট এবং তোলাবাজির সংস্কৃতি বাম আমলেও ছিল, কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর তা তৃণমূলের হাত ধরে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তবে এবার এই দুর্ভেদ্য সিস্টেমেও ফাটল ধরেছে বলে মনে করছেন অনেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে শাসকদলের নীচুতলার অনেক কর্মীই আর দলের হয়ে সেভাবে কাজ করেননি, কেউ কেউ আবার নীরবে বিজেপির হাত শক্ত করেছেন। ভয়ের জাঁতাকল কি এবার ভাঙবে? সেটাই বড় প্রশ্ন।
পাশাপাশি, এই নির্বাচনে মেরুকরণের রাজনীতি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিজেপি প্রথম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সংখ্যালঘু তোষণকারী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছে, ঠিক যে কৌশলে তারা দেশের অন্যান্য রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ভোট এককাট্টা করে ফায়দা লুটেছে। ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ঘুষপেটিয়াদের বিরুদ্ধে তাদের লাগাতার প্রচার রাজ্যের বেশ কিছু অংশে হিন্দুদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, দেশভাগ বা পার্টিশনের মতো ঐতিহাসিক কারণের জন্য বাংলার উচ্চবর্ণের ‘ভদ্রলোক’ সমাজের অবচেতন মনে বরাবরই একটা সুপ্ত মুসলিম-বিরোধী আবেগ লুকিয়ে ছিল। কিন্তু এতকাল বামপন্থী এবং উদারনৈতিক রাজনীতির আবহে সেটা প্রকাশ্যে আনাটা ‘পলিটিকালি ইনকারেক্ট’ বা সামাজিকভাবে তাচ্ছিল্য বা ঘৃণার ভয়ের কারণে মনে করা হত। এখন সেই দেওয়ালটা ভাঙছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো তৃণমূলের একচ্ছত্র দুর্গেও সংখ্যালঘু মহিলাদের মুখে শোনা যাচ্ছে যে, আগে যে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ ছিল না, এখন সেটা ক্রমেই শিকড় গাড়ছে। লড়াইটা এবার আক্ষরিক অর্থেই হাড্ডাহাড্ডি।
তবে, উত্তর ভারত বা হিন্দি বলয়ের মতো আগ্রাসী হিন্দুত্ব বাংলার মাটিতে এখনও সেই অর্থে সর্বজনীন রূপ পায়নি। বাংলার হিন্দুধর্ম অনেক বেশি সমন্বয়বাদী; এখানকার সমাজজীবনে শাক্ত ঐতিহ্য, মা কালীর উপাসনা এবং শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনের প্রভাব যথেষ্ট গভীর। বাংলায় ধর্ম এবং সংস্কৃতি হাতধরাধরি করে চলে, যেখানে দুর্গাপুজো যতটা ধর্মীয় আচার, তার চেয়েও অনেক বেশি এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বুঝতে পেরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের লড়াইকে ‘বাঙালি অস্মিতা’ বা বাঙালি পরিচয়ের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদকে ঠেকাতে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ঢাল করেছেন, যাতে দিল্লি থেকে আসা নেতারা বাংলার দখল নিতে না পারেন। বিজেপিও অবশ্য নিজেদের পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে। এবার তারা প্রথম থেকেই হিন্দিভাষী নেতাদের প্রচারে সামনে আনা থেকে বিরত থেকেছে। একেবারে শেষ লগ্নে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শা বা যোগী আদিত্যনাথ ছাড়া সেভাবে বহিরাগত নেতাদের দেখা যায়নি। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ভূপেন্দ্র যাদব গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে, পোস্টার বা সোশ্যাল মিডিয়া এড়িয়ে অত্যন্ত নীরবে শুধু সংগঠনের জাল বুনেছেন।
সবকিছুর পরেও, বাংলায় বিজেপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমকক্ষ কোনও গ্রহণযোগ্য বাঙালি মুখের অভাব। গোটা নির্বাচনটাই কার্যত ‘দিদি বনাম মোদি’র লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের ভোটারদের কাছে স্থানীয় স্তরে ভরসা করার মতো কোনও বিকল্প মুখ বিজেপি এখনও তুলে ধরতে পারেনি। এর পাশাপাশি এবার যুক্ত হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনের চরম বিতর্কিত বিষয়টি। লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়া, তার জেরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ, আর সেই প্রক্রিয়ায় বিজেপির প্রচ্ছন্ন সমর্থন- এসব শেষপর্যন্ত ইভিএম-এ ঠিক কী প্রভাব ফেলবে, তা কোনও রাজনৈতিক পণ্ডিতই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। এটি এমন এক তুরুপের তাস, যা ভোটের অঙ্ককে যে কোনও মুহূর্তে উলটে দিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন আসলে আগ্রাসী বিজেপির নিরলস আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এবং এক লড়াকু মমতার মরিয়া প্রতিরোধের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। এই বঙ্গযুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, তার রাজনৈতিক তরঙ্গ শুধু বাংলার সীমানায় আটকে থাকবে না, তা গোটা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির নকশাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। এখন অপেক্ষা ৪ মে’র, শ্যামাপ্রসাদের মাটিতে বাজপেয়ীর সেই আক্ষেপ এবার ইতিহাস হয়, নাকি বাঙালি আবেগের দুর্গ অটুট রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একবার বাজিমাত করেন- সেটাই দেখার।
(লেখক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক)



