TMC | ক্ষোভের আগুনে ছাই দুর্নীতি-ঔদ্ধত্য! এসআইআর, হিন্দুত্বের ভাষ্যের জয়

শেষ আপডেট:

গৌতম সরকার

‘এই তৃণমূল আর না…’

২০২১-এ বাবুল সুপ্রিয়’র গানের ভাষাকে ২০২৬-এ আপন করে নিল বাংলার মানুষ। বাবুল অবশ্য এখন তৃণমূলে (TMC)। কিন্তু তাঁর সেই গানের ‘ফুটবে এবার পদ্মফুল’ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিল বাংলা। উলটে তৃণমূলকে নির্মূল করার সেই একরোখা জেদে জয়ী হল এসআইআর। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর)-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড়ের বিন্দুমাত্র প্রতিফলন পড়ল না ইভিএমে।

পূর্বাভাস ছিল কোথাও ভারী বৃষ্টি, কোথাও ঝোড়ো হাওয়ার। সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের লেশমাত্র হল না। কিন্তু ভোটের সুনামি আছড়ে পড়ল গেরুয়া ঝড় হয়ে। ইভিএম খোলার পর থেকে প্রথমে ধীরে চললেও পরে ভোটগণনা যখন শেষ হল, তখন সেই ঝড়ের গতি অপ্রতিরোধ্য। বিজেপির আসন সংখ্যা ২০০ পার করিয়ে দেওয়ার সেই গণসংকল্পে হার হল তৃণমূল জমানার দুর্নীতির, কেলেঙ্কারির। শাসকদলের নেতা-কর্মীদের ঔদ্ধত্যেরও।

ভোটের খবর সংগ্রহের সময় মালবাজারের এক ফল বিক্রেতা এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের আর একদিনও চাই না। এঁরা আমাদের সর্বনাশ করে ছেড়েছেন।’ নির্বাচনি ফল প্রমাণ করল, ওই ফল বিক্রেতার আক্রোশ আসলে গোটা বাংলার। স্পষ্ট হল, গত কয়েক বছরের তৃণমূল শাসনে লাগামছাড়া চাকরি চুরি, র‌্যাশনে অনিয়ম, চরম বেকারত্ব ইত্যাদি আসলে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো জমা হয়েছিল মানুষের মনে।

সুনামির মতো সেই প্রতিবাদ আছড়ে পড়েছিল ইভিএমে। যে সুনামি ভাসিয়ে নিয়ে গেল তৃণমূলকে। খড়কুটো ধরে বাঁচার উপায়ও রাখল না। রাজ্যের তিনটি মেয়াদের শাসকদলকে একধাক্কায় নামিয়ে দিল ৯০-এরও কম আসনে। তাতে হিন্দুত্বের জয় মানতেও যেন তৈরি বাংলা। গেরুয়া সুনামির আভাস পেয়েই সোমবার দুপুরে শুভেন্দু অধিকারী বলে দেন, ‘হিন্দু ভোট পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। মুসলিম ভোটে বিভাজন হয়েছে।’

সদ্য সমাপ্ত ভোটের ফলাফলে শুভেন্দুর সেই মন্তব্য যে সঠিক, তা বুঝতে আর অসুবিধা নেই। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তাই বাংলায় বিজয়ী হল মেরুকরণও। মানুষ হিন্দু ও মুসলিম পরিচয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন। হিন্দু বিপন্ন বলে বিজেপির লাগাতার প্রচার আঁকড়ে ধরেছেন বহু সংখ্যক মানুষ। যে প্রবণতায় গা ভাসিয়েছিলেন বামমনস্ক অনেকেও। বিপন্নতার সেই পালে হাওয়া জুগিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশে একের পর এক হিন্দু নিগ্রহ।

যে কারণে ২৭ লক্ষ সহনাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলেও মানুষ বিশ্বাস করেছে ভুয়ো, মৃত ও অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে এসআইআর জরুরি ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা চরমে ওঠাও তৃণমূলের নির্বাচনি চিত্রে এমন ধসের আরেক কারণ। চাকরি, র‌্যাশন, নিয়োগ ইত্যাদি দুর্নীতিতে মানুষের ক্ষোভ এসআইআর আর মেরুকরণের ভয় দেখিয়ে আটকাতে পারেনি তৃণমূল।

মমতার সরকারকে বিদায় না করলে সুষ্ঠু শাসন আসবে না বলে বিশ্বাস করেছেন বঙ্গবাসী। উত্তরবঙ্গ ২০২১-এই পুরোপুরি তৃণমূল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তারপর কয়েকটি নির্বাচনে ইতিউতি ঘাসফুল ফুটলেও পদ্মের জমি তলে তলে শক্ত করে রেখেছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, রাজবংশী, আদিবাসী-নেপালি চা শ্রমিকের ঢালাও সমর্থনে তাই পদ্ম ফুটে উঠেছে।

একই কারণে পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম তো বটেই, বাঁকুড়া ও বীরভূমের একাংশে তৃণমূল হাওয়া হয়ে গিয়েছে। উত্তরবঙ্গ ও রাঢ়বঙ্গে ভোটের এমন সম্ভাবনা তৃণমূল জানতই। তবে আশা ছিল ভাগীরথী-গঙ্গাতীরের বাংলা তাদের মান বাঁচাবে। কিন্তু কলকাতা ও আশপাশের জেলা উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি সেই আশায় ছাই ঘষে দিয়েছে। বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত মানুষ কার্যত একজোট হয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ঢালাও ভোট দেওয়ায় খেলা ঘুরে গিয়েছে।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি শেষে বুমেরাং হয়েছে। নগদ জুগিয়ে সমর্থন কেনার সেই অভিযান ছিল আসলে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি। যা প্রত্যাশাকে শুধু বাড়িয়ে দেয়। যে প্রত্যাশায় আবেগ বা মতাদর্শের বন্ধন থাকে না। তাই নরেন্দ্র মোদি যখন প্রচারে এসে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ১৫০০-এর বদলে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে ৩০০০ টাকা বা চা শ্রমিকদের মজুরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৩০০-র পালটা ৫০০-র বেশি দেবেন বলে আশ্বাস দেন, তখন মানুষ বাড়তি টাকার পিছনে ছুটেছেন।

প্রশাসন ও পুলিশের দলদাস হয়ে যাওয়া, শাসকদলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না করা ইত্যাদিও মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছিল। এই দলতন্ত্র শুধু তৃণমূল নেতা-কর্মী নন, প্রশাসন-পুলিশের কর্তাদের জীবনাচরণ বদলে দিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ঔদ্ধত্যের জন্ম দিয়েছিল। বামফ্রন্ট জমানার শেষ দিকে এই একই ছবি ভেসে উঠেছিল। ২০১১-তে সেই ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল মানুষ।

২০২৬-এ আবার দিল। তবে বামফ্রন্টের ঔদ্ধত্য নয়, তৃণমূলের বিরুদ্ধে। যারা বামেদের ছেঁড়া চটিতে পা গলিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত বিধিনিষেধ কিছু ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গিয়েছে। কিন্তু মানুষ সেসবের তোয়াক্কা করেনি। এমনকি তৃণমূলকে হটানোর সংকল্পে মানুষের কাছে ফিকে হয়ে গিয়েছে বিজেপির এক দেশ, এক জাতি, এক ভাষা, এক ধর্মের মতো ভাষ্যও।

Categories
Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

Suvendu Adhikari | ৫ মন্ত্রীর দপ্তর বন্টন করে দিলেন শুভেন্দু! কোন দায়িত্ব পেলেন কে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: শনিবারই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ...

CM Suvendu Adhikari | পুনর্নিয়োগে ইতি, পদ হারালেন ষাটোর্ধ্ব আমলারা! মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকেই বড় পদক্ষেপ শুভেন্দুর

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের...

Suvendu Adhikari | অনুপ্রেরণা ছাড়াই কাজ করুন! আধিকারিকদের বার্তা শুভেন্দুর

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক:  নবান্নে এক নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতির...

Supreme Court | হারের ব্যবধানের থেকে বাতিল ভোটারের সংখ্যা বেশি! সুপ্রিম কোর্টে গেল তৃণমূল , কী বল শীর্ষ আদালত?

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে...