রাহুল দাস
বাঙালির মজ্জায় রাজনীতি। পরিবারের বৈঠকখানা থেকে শুরু করে বাজারের থলি হাতে আড্ডা, ভিড় বাস কিংবা ট্রেনের কামরা— সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কেবলই ভোটের ফলাফল। এই আগ্রহ কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই দেখার নয়, বরং রাজ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে চালিত হবে, তা বুঝে নেওয়ার এক সহজাত তাগিদ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নির্বাচন নিশ্চিতভাবেই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশা।
এবারের নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ। দীর্ঘকাল ধরে এ রাজ্যে নির্বাচন মানেই ছিল হিংসা, রক্তপাত আর চরম উত্তেজনার বাতাবরণ। সেই দীর্ঘস্থায়ী কলঙ্ক কিছুটা হলেও মুছে দিয়ে বহু বছর পর সাধারণ মানুষ অনেকটা স্বস্তিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। যদিও বিচ্ছিন্ন কিছু অশান্তির অভিযোগ উঠেছে, তবে নির্বাচন কমিশনের কঠোর মনোভাব এবং তৎক্ষণাৎ পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিয়েছে যে প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট পরিচালনা করা অসম্ভব নয়। এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা আগামীর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি সুস্থ ও শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
ফলাফল নিয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক শিবিরেরই নিজস্ব সমীকরণ ও দাবি রয়েছে। বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষা বা এগজিট পোল নানারকমের ইঙ্গিত দিলেও মনে রাখা প্রয়োজন যে, অতীতের বহু অভিজ্ঞতায় আগাম পূর্বাভাস বাস্তব ফলের সঙ্গে মেলেনি। পশ্চিমবঙ্গ একটি জনবহুল এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন রাজ্য। এখানে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ, প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক শক্তি এবং একদম শেষমুহূর্তের জনমত— এই বিষয়গুলো একত্রে মিলেমিশে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। তাই চূড়ান্ত গণনা শেষ হওয়ার আগে এবং প্রতিটি ব্যালট বক্সের রায় স্পষ্ট হওয়ার আগে নিশ্চিত করে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
সমীক্ষার ইঙ্গিত মেনে যদি রাজ্যে ক্ষমতার রদবদল ঘটে, তবে নতুন সরকারের কাঁধে চেপে বসবে আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার বোঝা। যার শীর্ষে থাকবে কর্মসংস্থান। শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ বছরের পর বছর ধরে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সরকারি দপ্তরের শূন্যপদ পূরণ, রাজ্যে নতুন শিল্প বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার ঘটানোই হবে আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে যদি বর্তমান সরকারই ফের ক্ষমতায় ফিরে আসে, তবে আসন সংখ্যা বাড়া বা কমার পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাবে আগামীর জনমতের আসল নির্যাস ও প্রত্যাশার গতিপ্রকৃতি।
তবে শাসনভার যার হাতেই থাকুক, রাজ্যের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া হল দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক হানাহানি থেকে স্থায়ী মুক্তি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজ্যে রাজনৈতিক সংঘাতের বলি হয়েছেন ১৬৭ জন মানুষ— যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গণতান্ত্রিক সহনশীলতা এবং বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাজনৈতিক মানসিকতার আমূল পরিবর্তনই এখন সময়ের প্রধান দাবি। বাংলার মানুষ আজ কেবল চটকদার স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কাজ, স্থিতি ও নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাকে। সাধারণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ ও সুন্দর হল, সেটাই হবে আগামীর সরকারের সাফল্যের প্রকৃত পরিমাপ।
(লেখক গৃহশিক্ষক ও অক্ষরকর্মী। তুফানগঞ্জের বাসিন্দা)



