শাসকের দম্ভ চূর্ণ ইভিএম-এ

শেষ আপডেট:

সন্দীপন নন্দী  

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের অভাবনীয় ফল প্রমাণ করল, নীরবতা মানেই শাসকপ্রিয়তা নয়। তৃণমূল কংগ্রেসকে টপকে বিজেপির বিপুল উত্থান আসলে নীরব ব্যালটে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। যুগে যুগে রাষ্ট্রের মৌষলকালে সমবেত স্বরই শাসকের ভ্রূকুঞ্চনের কারণ হয়েছে। এ রাজ্যের শাসক চেয়েছিল নাগরিক নীরব থাকুক, দৃঢ় হোক অনুদানের বিনিময়ে গড়ে ওঠা একমুখী কৃতজ্ঞতাবোধটুকু। তবু শাসকের আস্ফালন উপেক্ষায় লক্ষ মানুষের স্পর্ধা সঞ্চয় এবং ভোটবাক্সে অনুরণিত বিরুদ্ধস্বর অহংকারী শাসকের কাছে অস্বস্তির। অনভিপ্রেত এই অহংকে একনায়কত্বের মুকুল বলাই যায়। শাসক অনুগত প্রজার পাশে গড়তে চেয়েছে বিক্ষিপ্ত কণ্ঠরোধের প্রাচীর। ফলাফল? দিকে দিকে মাথা তোলে শাসকপ্রিয় ‘সাইলেন্স জোন’।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও পুলিশ আত্মচেতনার সংকটে সরকারের পাশেই দাঁড়িয়েছে বারবার। সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে দুষ্টের দমন নয়, ভূলুণ্ঠিত মানবিক বোধরক্ষার বদলে পুলিশ হতে চেয়েছে শাসক অনুগত। কখনও তারা গণসংহারে অবতীর্ণ প্রিয়তম সতীর্থ। আর এই ‘পাওয়ার অফ লাইসেন্স’ থেকেই পুলিশের সীমাবোধ হারিয়ে যায়। তখন সরকারের মুখ হয়ে বিচিত্র রাষ্ট্রীয় আয়নার সামনে দাঁড়ায় উর্দিধারীরা। ‘সাদা আমি কালো আমি’ হয়ে ওঠে অভব্য পুলিশ আধিকারিকের আত্মজীবনী। যে শ্রেণি প্রতিনিয়ত অশ্রাব্য কথায় জানতে চায়, আমরা তাদের ভয় পাই কি না! কিন্তু বিধানসভার এই জনাদেশ দেখাল, পুলিশি আস্ফালন দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না।

আসলে শাসকমাত্রই আত্মস্তুতি শ্রবণে মগ্ন এবং জনসংযোগরহিত। তাই ক্ষুধা, খুন, ধর্ষণ হতে রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদনেও মিথ্যের প্রলেপ থাকে। যাতে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে শাসককে বাদ্যরত নিরোই মনে হয়। রাষ্ট্রের চরম সংকটে এই প্রফুল্ল নিরোই প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের প্রতীক। যা সংবিধান এড়িয়ে মুখবন্ধ খামেই গণতন্ত্রের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারিকে সরকারি সংগ্রহশালায় গোপন রাখে। প্রকাশ্যে আসতে দেয় না। অব্যবস্থার বিভ্রমে বিচারের কাগজগুলো পড়ে থাকে ধুলোকীর্ণ আসবাবে। যে সূত্রে কামদুনি, আরজি কর, চোপড়ার ঘটনাপঞ্জিকে ইতিহাসের গর্ভে নিক্ষেপেই শাসকের প্রমোদ জারি থাকে। কিন্তু অকুতোভয় নাগরিকরা মিশে থাকেন সুবিচারের প্রত্যাশায়। যারা অক্লেশে জাস্টিস চেয়ে রাত দখলে নেমেছিল, তারাই আজ ভোটবাক্সে জবাব দিয়েছে।

কিন্তু এই জাস্টিস কী? ফিরে দেখলে জানা যায়, সত্যকথনে সব শাসকই রুষ্ট হয়। এই বোধ শাসকের অভূতপূর্ব জেনেটিক ডিসঅর্ডার বলেই বিবেচিত। ফলে মুখর প্রজাই শাসকের কাম্য নয়। শাসক চায় সাইলেন্ট সিটিজেন। যে শুনবে, টুঁ শব্দটিও করবে না। কিন্তু প্রভূত অবিচার ও অন্যায়ে সকল নীরবতাই কি সম্মতিসূচক? নীরবতা ভাঙার চেয়ে গড়া কঠিন। কেউ নীরবতা ভালোবাসেন, অনেকে বিপুল চাপে নীরব হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে নীরবতারও নির্দিষ্ট ভাষা থাকে। কেউ কিছু বলছেন না মানেই মুখ বুজে মেনে নেওয়া নয়। বরং ক্রমাগত নীরবতা প্রদর্শনের প্রেক্ষিতে অকর্মণ্য শাসকের প্রতি তাচ্ছিল্যের তালিকাই দীর্ঘ হয়।

মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, ফুল-পাখির ছবির বাইরে রাজনৈতিক মন্তব্যে রাষ্ট্রীয় রোষ— এসবই গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করেছে। প্রথম শিকার হয়েছেন সাংবাদিক বা ব্যঙ্গচিত্রীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে মত প্রকাশ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চিরকাল অতিসক্রিয়। সরকারের সমালোচনা বা শিক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখলেই আইটি অ্যাক্টে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু ভোটে জিতে ক্ষমতা লাভের পর সমস্ত দলই দাবি করে, বাকস্বাধীনতা নিরঙ্কুশ হতে পারে না। দেশবাসী এই পরম্পরাই দেখছে। তবে সোমবারের ফলাফল প্রমাণ করল, প্রশাসন দিয়ে হয়তো সাময়িক কণ্ঠরোধ সম্ভব, কিন্তু সাধারণ মানুষের নীরব প্রত্যাখ্যানই শেষ কথা। ব্যালটের নিস্তব্ধ বিপ্লবই বুঝিয়ে দিল, স্তব্ধতা মানেই আত্মসমর্পণ নয়।

(লেখক প্রাবন্ধিক শিলিগুড়ির বাসিন্দা)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উন্নয়নের নতুন ভোরে বাংলা

হরদীপ সিং পুরী হাওড়াকে একসময় বলা হত এশিয়ার শেফিল্ড। হুগল...

অভিষেকের ঘাড়েই হারের দায়

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দান আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বোর্ডের মিটিং যে...

বাংলার রাজনীতিতে এক নয়া অধ্যায়

সাত দশকের চেনা রাজনৈতিক ব্যাকরণ বদলে রাজ্যের মসনদে এবার...

পূর্ণ বৃত্ত পেল এক দীর্ঘ ইতিহাস

নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে ব্রিগেডের মঞ্চ, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও...