শুভময় মিত্র
অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে দ্রুত। অবনতির ক্ষত ফুটে উঠছে সর্বত্র। সাবধানবাণী প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অনেকদিন ধরেই। অনেকেই ক্ষতিটা তাঁর অন্তত হবে না ভেবে হাঁটা লাগিয়েছেন নিজের গন্তব্যের দিকে। একসময় এমন সতর্কীকরণ এন্তারই থাকত। কিন্তু মিলত কম। প্রযুক্তির আশীর্বাদে এখন নিখুঁতভাবে মিলে যায়। ৪ তারিখের কথাই ধরা যাক। বিকেলের পর থেকে আবহাওয়া বদলাবে, ঝড়-বৃষ্টি হবে বলে জানানো হয়েছিল। হয়তো কোথাও দু’এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। ওই পূর্বাভাসে বলা ছিল না পশ্চিমবঙ্গ জোড়া সুনামির কথা। আসলে হাওয়া অফিসের কাজ প্রকৃতি নিয়ে। অপ্রকৃতিস্থ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে ভোটের হাওয়া কোন দিকে ঘুরে যাবে সে নিয়ে ওরা মন্তব্য করেনি।
ওজোন লেয়ার ফুটো হয়ে গেলে আসলে কী হতে পারে তা নিয়ে ভাবার বদলে ভোটের ঝুলি পাংচার করার প্রযুক্তি নিয়ে জোরদার গবেষণা শুরু হয়েছিল। ভোটের মোহন্তরা বারবার সতর্ক করে যাচ্ছিলেন, ভুলেও নক্ষত্রের উত্থানপতনের জ্যোতিষপনা কেউ যেন না করেন। অভিজ্ঞ গণৎকাররা স্ক্রিনে নেমে পড়েছিলেন তাঁদের সৃষ্ট কুষ্ঠির ছক পরিবৃত হয়ে। জনগণ এখন সেয়ানা হয়ে গেছেন। কাউকে বিশ্বাস করেন না। দু’ভাগে ভোট হওয়ায়, সব দেখেছেন। ইন্টারভ্যালে পপকর্ন খেয়েছেন নিবিষ্ট মনে। কিছু ক্ষেত্রে কান খাড়া রেখেছেন কয়েকটি চ্যানেলে কারণ তাঁরা সাধারণত ফালতু বকেন না, নিদানের ট্র্যাক রেকর্ড ভালো। গত এক মাসে তাঁরা রাজ্য ঘুরে পালস বুঝে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে, বা বিনা যুদ্ধে শাসকদলের জয়ের কথা বলেছিলেন। অন রেকর্ড। তৃণমূল ও বিজেপি যথারীতি ঊরু চাপড়ে পরস্পরকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী কর্তব্যের খাতিরে অপরের দুর্গকে ধুলাগড় করে দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। দলের স্পিরিট যাতে তুঙ্গে থাকে তাই এই নির্ঘোষ। পাশাপাশি, যেহেতু জিতে ক্ষমতায় আসার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই, তাই কংগ্রেস অর্থাৎ অধীর চৌধুরী এবং সিপিএমের নতুন ব্রিগেডকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেছেন সবাই। যাঁরা এঁদের ভোট দিতে আগ্রহী নন তাঁরাও। অভিযোগহীন, পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিদের প্রতি এখনও মানুষের রাজনৈতিক না হলেও কিছু নৈতিক সমর্থন আছে। প্রধান যুযুধান দুই পক্ষের নেতা ও গিরগিটি মিডিয়ার মধ্যেও এই বিরল ভদ্রতা নজরে পড়েছিল। উলটো দিকে, নিশ্চিতভাবে জয়ী হবে, আইদার অর দলের বিরুদ্ধে নেহাতই ক্ষুদ্র বিরোধীদের কুৎসা ছড়াতে দেখা যায়নি। আসলে এদের ওপর চাপ ছিল না। ক্ষমতায় না থাকার এই এক সুবিধে। সরকার গড়ার অভিপ্রায় ছিল বলে মনেও হয় না। মাথা খারাপ?
কেন্দ্রীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়ে গিয়েছিল বুলডোজার চালানো। ইডির ধরপাকড়, শাসকদলের লোকদের হেনস্তা, অভাবনীয়, অদৃষ্টপূর্ব সামরিক উপস্থিতি দেখে আমরা তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম। শাসকদল ক্রুদ্ধ। অভিযোগ করা ছাড়া তাদের আর কিছুই করতে দেখা যায়নি। ক্ষমতাবলে কোনও প্রতিরোধ গড়তে পারলেন না তাঁরা। এতই দুর্বল সংগঠন? এতখানি হীনবল অবস্থা? পুলিশ অবধি মানছে না। এদিকে মূল রাস্তা থেকে ঢুকে পড়া সরু গলিতে, টালির ঘরে, ঝুপড়ির দেওয়ালে কান পাতলে চাপা শব্দ কানে আসছিল, ‘বিজেপি আসছে কিন্তু।’ শাসকদলের কল্যাণে যেসব গরিব লোকজন কিছু কাজ পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে আশঙ্কা ছিল, বিজেপি এলে সেই কাজটা থাকবে তো? একশো দিনের কাজের বারোটা বেজেছিল আগেই। আমি নিজে দেখেছি, যেটুকু টাকা মানুষের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ত তার অনেকটাই হাতিয়ে নিত স্থানীয় নেতারা। বিজেপি ক্ষমতায় এলে আরও দেবে, এই আশ্বাস পেয়েও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কেউ। ক্ষমতায় থাকা কাউকেই মানুষ আর বিশ্বাস করেন না। বিজেপির বর্গি স্টাইল আক্রমণ, ধর্মীয় আগ্রাসনের আবহে কেউই বুঝতে পারছিলেন না যে কী করবেন। কাকে ভোট দেবেন। হেভিওয়েট দুর্নীতিগুলো বিরোধীরা বারবার হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করছিলেন। পুরোনো স্টাইলে বামেরা চিন, ভিয়েতনাম, ভেনেজুয়েলা নিয়ে লাল প্রতিবাদে শামিল হননি। আধুনিক বাম প্রকৃতি অনেকটাই বদলে গেছে। অতএব তাঁরা জান লড়িয়ে প্রচার ও জনসংযোগের চেষ্টা করে গেছেন মরিয়া হয়ে। মানুষের মুখে এক ধরনের সমর্থনের চেহারাও স্পষ্ট হচ্ছিল। ‘নতুন সরকার আমরাই গড়ব’ একথা তাঁদের বলতে শুনিনি। তাঁরা শুধুমাত্র বলে গেছেন, ‘বাম-ই বিকল্প’।
আরজি করের ন্যক্কারজনক ঘটনার পর বামপন্থীদের লড়াইটা জোরদার হয়েছিল। শাসকদল সফল হয়েছিল ব্যাপারটা গুলিয়ে দিতে। সেসময় বিজেপিকে সেভাবে প্রতিবাদের আসরে নামতে দেখা যায়নি। জনগণ কিছুদিন পরে নির্লিপ্ত হয়ে যায়। ‘প্রতিবাদ এখন ফ্যাশনে পরিবর্তিত হয়েছে’, ‘রাজনৈতিক স্বার্থে বামেরা আন্দোলনটা ব্যবহার করেছে’ কানাঘুষো শোনা যায় নয়, রীতিমতো জোরালো কলরবও শোনা গেছে। এসবের মধ্যে ‘বিজেপি এসে গেছে’ বাক্যটিও হাওয়ায় পাক খেতে শুরু করেছিল। অত্যাচার হয়েছে। একটা বিশাল সুবিধেবাদী জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। মাত্রাছাড়ানো লোভ প্রশ্রয় পেয়েছে। গরিব বড়লোক সবাই বেজায় চটে থাকলেও মুখে তেমন কিছু বলেননি। কিন্তু তুমুল অসন্তোষের হদিস টিভি, ইউটিউব, ফেসবুক পায়নি। চোখের সামনে আইপ্যাক উবে গেল। প্রশ্নের উত্তরে বাংলার মানুষ নির্বিকারভাবে গুল মেরে গেলেন। ভোটের আগে শাসকের বিরুদ্ধে কিছু বলে ফেললে পরে বিপুল মার খেতে হতে পারে, সেটাও অন্যতম কারণ। এসআইআর-কে শাসকদল কাজে লাগাতে ব্যর্থ হল। ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ফেস্টুনটাও উধাও হয়ে যায় এবছর। সম্ভবত আদতে শৌখিন সমাজমাধ্যমের কলমচিদের প্রতিভায় ভাটা পড়েছিল। সবকিছু যে ঐতিহাসিকভাবে ভুল প্রমাণিত হবে, ভূত দূর অস্ত, জ্যান্ত শাসকের এই হাল হবে, নষ্ট-দামু-ও প্রেডিক্ট করতে পারতেন বলে মনে হয় না। অটোর ওপরে মাইকে প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড করা কণ্ঠ কি বাংলার লোকের কাছে আগ্রাসী ভিলেনের ডায়ালগসম মনে হয়েছিল? জানার উপায় নেই। এই পরিস্থিতিতে একদা লড়াকু, দুর্ধর্ষ নেত্রীকে অসংলগ্ন, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। জ্যোতিবাবু, বুদ্ধবাবুর ট্রেডমার্ক ঔদ্ধত্য দেখেও মমতা শিখলেন না? আমরা অবাক হচ্ছিলাম। অদ্ভুত কিছু ইঙ্গিত ছিল বৈকি। রাস্তায় তৈরি হওয়া অজস্র কমলা মন্দিরে হিন্দি ভজনের পাশাপাশি বাজতে শুনেছি, ‘আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা, দোষ কারো নয় গো মা।’
ফালক্রামের বাংলা হল নিভ্রবিন্দু। ওইখানেই ঘটে গেল আসল ঘটনা। মোদি, অমিত শা’র মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণে তেমন মুগ্ধতার কারণ ঘটেছিল বলে মনে হয় না। আসলে কিছু লোক আখের গুছিয়ে নিয়েছে, রাজ্যের সার্বিক অবস্থা ভয়াবহ, এনাফ ইজ এনাফ। নিশ্চিতভাবে এই ক্ষোভের বাষ্পটি চেপে রাখা ছিল। মরিয়া পশ্চিমবঙ্গবাসী এক ঝটকায় বাজি রাখলেন অবাঙালি গেরুয়া দলের ওপর। মুসলিম, সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে সুবিধে হল না। মাছ-মাংস খাবার মতো বিষয়কে পাত্তা না দিয়ে, জয় শ্রীরাম হুংকার শুনেও না শুনে চলে গেলেন অগ্নিকন্যার বিরুদ্ধে। সুমনের গানের একটি লাইনের টুকরো এখন শুনলে মনে হয় সেটা বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে, ‘অধিকার বুঝে নেওয়া প্রখর দাবিতে।’ সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘অধিকার কে কাকে দেয়? অধিকার কেড়ে নিতে হয়।’ এসবই অন্য যুগে, ভিন্ন প্রেক্ষিতে রচিত। আসলে ছাব্বিশের বাংলা বদলে গেছে ভয়াবহভাবে। সেন্টিমেন্টকে হাতিয়ার করাটা অনাধুনিক অস্ত্র হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত পরিসরে কোণঠাসা অবস্থায় রোমান্সের বদলে স্বার্থের ছুরিটা চমকাতে শুরু করেছে। আমার পরিচিত এক ভদ্র, সৎ, শিক্ষিত লোক, বামফ্রন্টের নিশ্চিত ভোটার, বললেন ‘সিপিএমকে আজও সমর্থন করছি, কিন্তু ভোট নষ্ট করে লাভ নেই, আগে ওগুলোকে ভাগাতে হবে, এবারে বিজেপিকে দিলাম। কী করে দেখি, তারপর দরকার পড়লে আবার সিপিএমকে ফিরিয়ে আনব। বদলে দেব পরের বার।’ অর্থাৎ ডেভিলের অল্টারনেটিভ হল ডেভিল। ছ’টি গৌরবময় এডিশন সত্ত্বেও লালমোহনবাবু তাঁর কলমের ভ্রান্তি ‘সাতে’ শুধরে দিয়েছিলেন কি না তা আমাদের জানা নেই।
(লেখক প্রাবন্ধিক)



