বদলার সংস্কৃতি নয়

শেষ আপডেট:

‘বদলা নয়, বদল চাই’ স্লোগানে ভর করে বাংলার মসনদে বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৫ বছর পর তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজয়বার্তাতে ‘বদলাও’ অর্থাৎ পরিবর্তনের কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু ১৫ বছর আগের মতো এবারও সেই বার্তা স্রেফ কথার কথা থেকে গেল। বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে গেরুয়া পতাকা হাতে একদল লোক তাণ্ডব করে চলেছেন।

তবে আশার কথা, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিদায়ি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি আরও কয়েকজন নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক দলীয় কর্মীদের সংযত থাকার বার্তা দিয়েছেন। দলীয় অনুশাসন মেনে না চললে দল থেকে বের করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। শমীক জানিয়েছেন, তিনি বিজেপির তৃণমূলিকরণ করতে দেবেন না।

গেরুয়া শিবিরের অবশ্য ভিন্ন সাফাইও আছে। তাদের বক্তব্য, হিংসায় যুক্তদের কেউ বিজেপির কর্মী নন। সুযোগ বুঝে ঝান্ডা বদলে তাঁরা বিজেপির বদনাম করছেন। ভোটপরবর্তী হিংসায় পশ্চিমবঙ্গে এখনও পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে যেমন তৃণমূল কর্মী রয়েছেন, তেমনই আছেন বিজেপি কর্মী। জিয়াগঞ্জে লেনিনের মূর্তি ভাঙচুর করা হয়েছে। একাধিক তৃণমূল কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। ভাঙচুর হয়েছে এসইউসিআই(সি) দলের কার্যালয়ও।

গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক পুলিশ আধিকারিক। খাস কলকাতার বুকে নিউ মার্কেটে বুলডোজার দিয়ে মাংসের দোকান এবং তৃণমূলের কার্যালয় ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে-পরে হিংসা নতুন ঘটনা নয়। এবার বরং দু’দফার ভোটপর্বে কোথাও খুন-জখম হয়নি। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে নির্বাচন কমিশন অশান্তি আটকাতে অনেকাংশে সফল হয়েছে।

কিন্তু ভোটের ফল বেরোনোর পর হিংসাত্মক ঘটনাগুলিতে কমিশনের ওই সাফল্য খানিকটা হলেও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেন হিংসা ঘটবে- সেই প্রশ্ন অবান্তর নয়। বদলার সংস্কৃতিতে অবিলম্বে লাগাম না টানলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে বাধ্য।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে জনমানসে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভোটের ফলে। তৃণমূল নেত্রী যতই অভিযোগ করুন, বাস্তবে জনতার রায়ে তাঁর দল এই মুহূর্তে বিরোধীপক্ষে। ভোটের ফলকে সামনে রেখে রাজনৈতিক হানাহানি সভ্য গণতন্ত্রের পরিচয় নয়। বরং বিজয়ীর দায়িত্ব সর্বাধিক। পরাজিতকে রক্ষা করাটাও বিজয়ীর কর্তব্য।

তৃণমূল জমানায় কী ঘটেছিল, ভোটের ফল প্রকাশের পর বিজেপি কীভাবে তৃণমূলি আক্রমণের শিকার হয়েছিল ইত্যাদি যুক্তি দেখিয়ে পালটা মারের রাস্তায় হাঁটার অর্থ গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করা। শমীক, শুভেন্দুরা সেই বার্তা দিলেও নানুর, বেলেঘাটা, নিউটাউনে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেই চলেছে। মতের অমিলের অস্তিত্ব ও তাকে সম্মান জানানো গণতন্ত্রের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য। পরমতসহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের মূল চরিত্র।

সেকারণে শাসক এবং বিরোধী- দুই পক্ষের সংযম আবশ্যিক। উভয় শিবিরের লুম্পেন বাহিনী যাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলে তাণ্ডব করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক নজর রাখা পুলিশ ও প্রশাসনেরও দায়িত্ব। বদলার সংস্কৃতিতে শান দিলে পশ্চিমবঙ্গেরই ক্ষতি। একথা বিজেপি এবং তৃণমূল- উভয় শিবিরকে মনে না রাখলে রাজ্যের অমঙ্গল।

বিজয়ীপক্ষ বিজয় মিছিল করবেই। কিন্তু বিজয় উদযাপন করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ করা অন্যায়। ভারত বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ। ডান, বাম- সমস্ত পক্ষকে নিয়ে গণতন্ত্রের চাকা ৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে গড়িয়ে চলেছে। শুধুমাত্র ভোটে জিতেছে বলে কোনও পক্ষ পরাজিতের ওপর চড়াও হলে, বিপক্ষের দলীয় দপ্তরে হামলা চালালে, দলীয় প্রতীক, মূর্তি বা ছবি ভাঙচুর করলে গণতন্ত্রের গতিরুদ্ধ হতে বাধ্য।

বাংলার মানুষ ১৫ বছর পর আবার পরিবর্তনের পক্ষে দু’হাত তুলে সমর্থন করেছেন। সেই জনাদেশকে সম্মান দিয়ে হিংসার পথ বর্জন করে চলাই প্রকৃত রাজধর্ম।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

বন্ধুর পথ

নির্বাচনের পর রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিজেপি একক...

গভীর অন্ধকার

ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্কিত ঘটনা হিসেবে...

আগে চাই চাকরি

নগদ নারায়ণ পাইয়ে দেওয়া। সরকারি ডোল। যা একসময় নরেন্দ্র...

কংগ্রেসে সমস্যা

গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও কংগ্রেস কার্যত সমার্থক। স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকে...