সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: যত কাণ্ড আলুতে। ভোটের বাজারে আলুও (Potato) যেন পণ্য। তবে কেনাবেচা করা যায় না। দরকষাকষি করা যায়। চলতি মরশুমে বাড়তি ফলনে বাজারে মন্দার আভাস ইতিমধ্যে স্পষ্ট। তার ওপর কোনও চাষি যদি ভাবেন লোকসানে বিক্রি করবেন না, তাহলেও মুশকিল। হিমঘরে রাখতে অনেক হ্যাপা। বন্ড নিয়ে কালোবাজারি শুরু হল বলে।
আলুচাষিদের সর্বনাশ হলে শাসকদলেরও মাথায় বাড়ি। বিরোধী দলগুলি মুখিয়ে আছে, সব দায় তৃণমূল সরকারের ঘাড়ে চাপানোর জন্য। তার মহড়াও শুরু হয়ে গিয়েছে। চাষিদের সঙ্গে তাঁদেরও সর্বনাশের আঁচ পেয়ে তৃণমূল নেতারা বরং অনেক সংযত। তৃণমূলের জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজেশকুমার সিংয়ের সাবধানি বক্তব্য, ‘পুলিশ ও প্রশাসন যেভাবে বন্ড বণ্টন এবং আলুর লোডিংয়ের পরিকল্পনা করেছে, একদম সেভাবেই সবটা হবে।’
তাঁর বক্তব্য, ‘কারও প্ররোচনায় দলের কেউ পা দেবেন না।’ ভালো ফলন হলেও দামে মার খেলে বিপদ শুধু তো চাষির নয়, তার প্রভাব পড়বে কৃষিশ্রমিক, পরিবহণ ব্যবসায়ী, হিমঘর মালিক, সার ব্যবসায়ী, এমনকি আলু চাষে বিনিয়োগকারীদের ওপর। সপ্তাহখানেকের মধ্যে উত্তরবঙ্গের কৃষিবলয়ে সাদা জ্যোতি ও লাল হল্যান্ড আলু তোলার ধুম পড়বে।
এই দুই আলুর দর এখন জমি থেকেই বিক্রি করে দিলে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল। কৃষকদের হিসেবে এই দামে আলু বিক্রি করার অর্থ কুইন্টাল প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লোকসান। লোকসানের বিপদ এড়াতে আলু হিমঘরে রাখতে চাইলে আবার বস্তার দাম, লোডিং-আনলোডিং ও পরিবহণের খরচ মিলে কুইন্টাল প্রতি ১০০ টাকা ঘাড়ে চাপবে। হিমঘরে বন্ড বুক করতে হলেও বস্তা প্রতি আগাম ১০ থেকে ১৫ টাকা গুনতে হবে।
ফলে চাষি এখন দ্বিধায়- লোকসানে বেচবেন না ঘরের টাকা গচ্চা দিয়ে হিমঘরে সংরক্ষণ করবেন। রাজ্য সরকার ৯৫০ টাকা প্রতি কুইন্টাল আলু কেনার কথা বললেও তাতে আগ্রহ নেই অনেক কৃষকেরই। তাছাড়া সরকারের কাছে বেচতেও নানা হ্যাপা। কিষান ক্রেডিট কার্ড বা কৃষকবন্ধু প্রকল্পে নথিভুক্ত একজন কৃষকের থেকে সর্বাধিক ৩৫ কুইন্টাল আলু কিনবে কৃষি বিপণন দপ্তর। সেই আলুর ব্যাস হতে হবে ৫০ থেকে ১০০ মিলিমিটার। ওজন হতে হবে ন্যূনতম ৫৩ গ্রাম।
সব কি আর মাপে মাপে মেলে! ফলে সরকারকে বিক্রি করতে এত অনীহা। আবার হিমঘরে রাখতে হলে আগে ঝাড়াই বাছাই, তারপর বস্তাবন্দি করে হিমঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর খরচও কৃষকের। সিপিএম প্রভাবিত সারা ভারত কৃষকসভার জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক প্রাণগোপাল ভাওয়াল বলেন, ‘সরকার যেভাবে চাইছে, সেভাবে কোনও কৃষক আলু বিক্রি করবেন না।’
সরকারি হিসেবে শুধু জলপাইগুড়ি জেলায় নথিভুক্ত আলুচাষির সংখ্যা এক লাখ পঁচিশ হাজারের মতো। এর বাইরে রয়েছেন বিশাল সংখ্যক মানুষ বা আড়তদার, যাঁরা জমি ভাড়া নিয়ে আলু চাষ করান। চাষিদের পাশাপাশি তাঁরাও বন্ডের জন্যে হন্যে হবেন ক’দিন পরে। রাজ্য হিমঘর মালিক সমিতির উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক কমিটির সম্পাদক মনোজ সাহা বলছেন, ‘এখনও বন্ডের জন্যে বাড়তি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না বটে। তবে আগামী সপ্তাহে পুরোদমে আলু ওঠা শুরু হলে পরিস্থিতি বোঝা যাবে।’
বন্ডের জন্যে আগ্রহ বাড়লেই প্রতি বছর শুরু হয়ে যায় বেলাগাম কালোবাজারি। প্রভাব খাটিয়ে হিমঘর থেকে বন্ড হাতিয়ে বাড়তি মুনাফা লোটার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের স্থানীয় চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়াল নেতাদের বিরুদ্ধে। বাড়তি ফলনের কারণে বাজার মন্দা হলে চাষি হিমঘরে আলু রাখার পথে হাঁটলেই বন্ড নিয়ে হাহাকার শুরু হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক চন্দন দত্ত বলেন, ‘হিমঘরগুলিকে চাপে ফেলে বন্ড হাতিয়ে লাখ লাখ টাকা পকেটে ভর্তি করেন যে তৃণমূল নেতারা, তাঁদের সরাসরি বলছি, এবারে যেন কেউ সেই পথে না হাঁটেন। বন্ড নিয়ে সমস্যা হলে চরম মূল্য দিতে হবে প্রশাসন এবং বন্ডের কালোবাজারিতে যুক্ত তৃণমূল নেতাদের।’
পরিস্থিতি আঁচ করে হিমঘরে লোডিং নির্বিঘ্নে মিটিয়ে দিতে নীচুতলা পর্যন্ত নেতা- কর্মীদের এখন নির্দেশ দিচ্ছে তৃণমূল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে যে ভোটে মার খাওয়া অবশ্যম্ভাবী। ভোটের রাজনীতির পাশা খেলায় গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি এখন আলু।

