- সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গে এখন খবরের শিরোনামে একটাই শব্দ— ‘এসআইআর’ বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন। খটমট সরকারি শব্দ, কিন্তু এর প্রভাব ভয়াবহ। ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো একটা রুটিন কাজ, যেটা দেশের আর দশটা রাজ্যে নিছকই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সেটাই বাংলায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মরণফাঁদ। খবর আসছে মালদা থেকে, নদিয়া থেকে। এসআইআর-এর চাপে আত্মঘাতী বিএলও (বুথ লেভেল অফিসার)। মালদার ইংরেজবাজারের সমপ্রীতা চৌধুরী সান্যাল বা নদিয়ার রিঙ্কু তরফদার— এঁরা তো নিছকই পরিসংখ্যান নন, এঁরা আমাদেরই কারও পরিবারের মা-বোন, যাঁদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল গণতন্ত্র রক্ষার এক অসম্ভব বোঝা।
ভাবতে অবাক লাগে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের এখনও ঢের দেরি। তার আগেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে আসল যুদ্ধের সময় কী হবে? নির্বাচন কমিশন কি আদৌ রক্তপাতহীন নির্বাচনের গ্যারান্টি দিতে পারবে? উত্তরটা আমরা সবাই জানি, আর সেই উত্তরটা খুব একটা সুখকর নয়।
প্রযুক্তির বিড়ম্বনা বনাম বাস্তবের মাটি
নির্বাচন কমিশন আজকাল খুব ‘হাই-টেক’ হয়েছে। দিল্লি থেকে ফরমান আসছে, সব কাজ করতে হবে অ্যাপ-এর মাধ্যমে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘গাড়ুদা’। শুনতে খুব গালভরা, কিন্তু বাংলার মাটির বাস্তবটা কি দিল্লির এসি ঘরে বসে বোঝা যায়? বাংলার গ্রামীণ এবং সীমান্ত এলাকায় যেখানে ফোনে কথা বলার নেটওয়ার্ক ঠিকমতো পাওয়া যায় না, সেখানে রিয়েল-টাইম ডেটা আপলোড করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বিএলও-দের।
মালদা বা মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট। এখানকার একটা বড় অংশের মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক। পেটের টানে ভিনরাজ্যে থাকেন। বিএলও যখন বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন ভেরিফিকেশন করতে, তিনি সেই ভোটারকে পাচ্ছেন না। এখন অ্যাপে যদি তিনি ‘অনুপস্থিত’ মার্ক করেন, তবে স্থানীয় রাজনৈতিক দাদারা এসে হুমকি দিচ্ছেন— ‘নাম বাদ দিলে দেখে নেব!’ আর যদি উপস্থিত দেখান, তবে কমিশনের শোকজ নোটিশ বা সাসপেনশন। অর্থাৎ, বিএলও’র অবস্থা অনেকটা জঁাতাকলের মাঝখানের শস্যদানার মতো। টেকনিকাল ত্রুটি বা ‘পিডিএফ টু সিএসভি’ কনভার্সনের গরমিল— সব দোষ কি শুধুই মাঠের কর্মীর? অথচ ওপরতলার বাবুরা এসি ঘরে বসে পরিসংখ্যান গুনছেন, আর মাঠের কর্মীরা প্রাণ দিচ্ছেন। এই প্রযুক্তিগত অসংবেদনশীলতাই কি সমপ্রীতা বা রিঙ্কুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল না?
‘ভুল’ কারণে বাংলার খবর হওয়া
এক সময় নির্বাচনের সময় হিংসার সমার্থক ছিল বিহার বা উত্তরপ্রদেশ। নব্বইয়ের দশকে লালু-রাজ বা ইউপি-র মাফিয়ারাজের গল্প শুনে আমরা শিউরে উঠতাম। আর আজ? চাকা সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়েছে। বিহার বা ইউপি-তে এখন ভোট হয় অনেকটাই শান্তিতে। টিএন শেষণ থেকে শুরু করে আজকের যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন— সেখানে পেশিশক্তিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা গিয়েছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের বাংলায় পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা—ভোট মানেই বারুদের গন্ধ আর রক্তের দাগ।
কেন এমন হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের কাঠামোগত হিংসার মধ্যে। অন্য রাজ্যে হিংসা হয় জাতপাত বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে। কিন্তু বাংলায় তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ‘দলতন্ত্র’। এখানে প্রশাসন আর রাজনীতির মধ্যেকার লক্ষ্মণরেখাটা মুছে গিয়েছে। একজন বিএলও জানেন, তিনি যত নিরপেক্ষভাবেই কাজ করার চেষ্টা করুন না কেন, কোনও না কোনও পক্ষের কোপে তিনি পড়বেনই। এই ভয়টাই তাঁদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। পুলিশ-প্রশাসন যেখানে ঠুঁটো জগন্নাথ, সেখানে একজন সামান্য স্কুল শিক্ষিকা বা করণিক কার ভরসায় বুক চিতিয়ে কাজ করবেন?
৫৮ লক্ষের পরিসংখ্যান ও রাজনীতির উত্তাপ
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এবারের এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাকি রাজ্যে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে বা যাচাইয়ের আওতায় এসেছে। সংখ্যাটা বিশাল। আর এই বিশাল সংখ্যার দায় গিয়ে পড়ছে ওই সামান্য বেতনের বিএলও’র ওপর। বিশেষ করে নদিয়া বা উত্তর ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলোতে, যেখানে মতুয়া ও রিফিউজি সম্প্রদায়ের বাস, সেখানে এই নাম কাটার আতঙ্ক দাবানলের মতো ছড়িয়েছে।
বিরোধী দলগুলো বলছে, শাসকদল বেছে বেছে তাদের ভোটারদের নাম কাটাচ্ছে। আর শাসকদল বলছে, কমিশন কেন্দ্রের হয়ে কাজ করছে। এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝে বলির পাঁঠা হচ্ছেন কে? সেই বিএলও। জনরোষের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকেই। নাম কাটার এই বিশাল তালিকার পেছনের কারণ যা-ই হোক, মাঠপর্যায়ে তার অভিঘাত সামলানোর কোনও সুরক্ষা কবচ বিএলও-দের দেওয়া হয়নি।
রক্তাক্ত গণতন্ত্রের অশনিসংকেত
২০২৬-এর দিকে তাকালে বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। এখনই যদি ভোটার লিস্ট আপডেট করতে গিয়ে লাশের সারি বাড়ে, তবে ভোটের সময় কী হবে? বিহার মডেল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, সদিচ্ছা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। সেখানে বুথ দখল এখন ইতিহাস। কিন্তু বাংলা সেই পুরোনো হিংসাকেই ‘কালচার’ বা সংস্কৃতি হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে। এখানে রাজনীতি মানেই এখন ‘দখলদারি’। আর এই দখলদারির লড়াইয়ে বিএলও-রা হলেন প্রথম ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’।
নির্বাচন কমিশনকে বুঝতে হবে, বাংলাটা দিল্লি বা গুজরাট নয়। এখানকার মাটির চরিত্র আলাদা, রাজনীতির ব্যাকরণ আলাদা। শুধুমাত্র দিল্লির ধমক, শোকজ নোটিশ আর ভোটের সময় কয়েক কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে এখানে ভোট করানো যায়, কিন্তু প্রাণ বাঁচানো যায় কি?
আজ রাজ্যজুড়ে একটাই প্রশ্ন— গণতন্ত্র মানে কি শুধুই ইভিএম আর ভিভিপ্যাট? নাকি তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের প্রাণের দাম? নেতারা ভাষণ দেবেন, প্রতিশ্রুতি দেবেন। কিন্তু যে পরিবার তার রোজগেরে সদস্যকে হারাল, তাদের কাছে গণতন্ত্র শব্দটাই এখন একটা নিষ্ঠুর রসিকতা। ২০২৬-এ ‘রক্তহীন’ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখাটা কি তবে বিলাসিতা? বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত সেই আশার আলো দেখাচ্ছে না। বরং মনে করিয়ে দিচ্ছে, বাংলায় ভোট উৎসব নয়, ভোট মানে এক অঘোষিত যুদ্ধ, যেখানে সেনাপতিরা নিরাপদ থাকেন, আর সৈন্যরা ফেরেন কফিনে বন্দি হয়ে।
যেদিন বাংলার প্রশাসন দলদাসের ঊর্ধ্বে উঠে মেরুদণ্ড সোজা করতে পারবে, যেদিন নির্বাচন কমিশন প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার মিশেল ঘটাতে পারবে—সেদিন হয়তো আমরা রক্তহীন নির্বাচনের স্বপ্ন দেখতে পারব।
(লেখক সাংবাদিক)

