সনাতন পাল
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব নির্বাচন। আর সেই উৎসবে অংশগ্রহণের প্রাথমিক এবং চূড়ান্ত ছাড়পত্র হল একটি সচিত্র পরিচয়পত্র এবং ভোটার তালিকায় নিজের জ্বলজ্বলে নামটি। কিন্তু কী হয়, যখন একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একজন সাধারণ মানুষ জানতে পারেন যে, নিজের দেশেই তিনি আজ ভোটাধিকারহীন? ঠিক এই ভয়াবহ এবং অমানবিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই বর্তমানে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষ। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)–এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব আতঙ্ক। পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে। সংখ্যার নিরিখে এই তথ্য শুধু চমকে দেওয়ার মতোই নয়, বরং এটি একটি সুগভীর প্রশাসনিক গাফিলতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার চূড়ান্ত নিদর্শন।
পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখলে এই সংকটের মাত্রা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এই তালিকা অনুযায়ী, ভোটার ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় কোপটি পড়েছে রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলির ওপর। গোটা রাজ্যের মধ্যে তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার নিরিখে শীর্ষে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা। সেখানে ১২ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাতিল হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। যেখানে বাতিলের খাতায় চলে গিয়েছে ৭ লক্ষ ৪৮ হাজারের বেশি মানুষের নাম। আর যদি আমরা উত্তরবঙ্গের দিকে তাকাই, তবে এই ছবিটা আরও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গে বাতিলের তালিকা সবচেয়ে দীর্ঘ মালদা জেলায়। সেখানে ৪ লক্ষ ৫৯ হাজারের বেশি মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এর পরেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে উত্তর দিনাজপুর এবং কোচবিহার। উত্তর দিনাজপুরে ৩ লক্ষ ৬৩ হাজার এবং কোচবিহারে ২ লক্ষ ৪২ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়েছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে।
এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক দানা বেঁধেছে। যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের বেশিরভাগই প্রান্তিক, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এঁদের অনেকেই বংশপরম্পরায় এই বাংলার মাটিতে বসবাস করে আসছেন। আচমকা ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়ার অর্থ কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার হারানো নয়; এর অর্থ হল পরিচয়হীনতার এক অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হওয়া। আজকের দিনে ভোটার কার্ড বাতিল হওয়া মানে সরকারি সুযোগসুবিধা, র্যাশন, স্বাস্থ্যসাথী বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা। একইসঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে সিএএ বা এনআরসি নিয়ে যে ডামাডোল চলছে, তার প্রেক্ষাপটে এই নাম বাদ যাওয়া মানুষের মনে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’-এর জুজু তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ রাতে ঘুমোতে পারছেন না।
এখন প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? সচেতন নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছে, এই বিপুল বিপর্যয়ের জন্য রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের প্রশাসনিক গাফিলতি ও চরম উদাসীনতাই প্রধানত দায়ী। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হতে পারে এবং তারা তাদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই কাজ করে, কিন্তু ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হয় রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের হাত ধরেই। বিএলও থেকে শুরু করে বিডিও বা মহকুমা শাসকের দপ্তর- গোটা চেনটি রাজ্য প্রশাসনের অধীন। যখন এই এসআইআর প্রক্রিয়া চলছিল, তখন রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষকে কতটা সচেতন করেছিল? যাঁদের নথিপত্রে সামান্য ভুলভ্রান্তি ছিল, তাঁদের সেই ভুল সংশোধনের জন্য প্রশাসন কতটা মানবিক ও সাহায্যকারী ভূমিকা পালন করেছিল? উত্তরটা অত্যন্ত হতাশাজনক।
বর্তমান এই পরিস্থিতিতে সমালোচনার মুখে শুধু রাজ্য নয়, কাঠগড়ায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকারও। বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার এবং দল- দুটি সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা। রাজনৈতিক দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস হয়তো সিএএ বা এনআরসি-র তীব্র বিরোধিতা করে পথে নামছে, সভাসমাবেশ করছে এবং নিজেদের সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু অন্যদিকে তাদেরই পরিচালিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার চরম গাফিলতিতে সেই একই সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ সংখ্যায় বাদ পড়ে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। প্রশাসন যদি প্রথম থেকেই সতর্ক থাকত, বিএলও-দের কাজের ওপর সঠিক নজরদারি চালাত এবং সাধারণ মানুষকে তাঁদের অধিকার ও করণীয় সম্পর্কে লাগাতার সচেতন করত, তবে হয়তো আজ এতগুলো মানুষকে এই ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে যেতে হত না।
এটা ঠিক যে, ভূতুড়ে ভোটার, স্থানান্তরিত বা মৃত ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া নির্বাচন কমিশনের একটি রুটিন কাজ। কিন্তু ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়াটা কোনওভাবেই নিছক রুটিন কাজ হতে পারে না। এর মধ্যে বহু জীবিত, বৈধ ও স্থায়ী নাগরিকের নাম যে কেবল যান্ত্রিক ও প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে বাদ পড়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ত্রুটি সংশোধনের জন্য যে সময় বা সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল, তার প্রচারও তৃণমূল স্তরে সঠিকভাবে হয়নি। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের চা বলয়, বনাঞ্চল বা সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে- যেখানে শিক্ষার হার তুলনামূলকভাবে কম এবং মানুষ দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব সঠিকভাবে পৌঁছায়নি। ফলস্বরূপ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর বা কোচবিহারের মতো জেলায় আজ হাহাকার তৈরি হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের বঞ্চনার গভীর ক্ষোভ রয়েছে। তাঁরা বারবার অভিযোগ করেছেন যে, সামগ্রিক উন্নয়নের নিরিখে উত্তরবঙ্গকে সবসময় ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে। এখন এই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ আজ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় দিশেহারা। তাঁরা কাজ ফেলে ছুটছেন পঞ্চায়েত অফিস থেকে বিডিও অফিসে, কিন্তু অধিকাংশ জায়গাতেই তাঁরা উপযুক্ত সাহায্য বা সদুত্তর পাচ্ছেন না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সাধারণ মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করে তুলছে।
এই অবস্থায় রাজ্য সরকারের উচিত অবিলম্বে দায়বদ্ধতা স্বীকার করে ময়দানে নামা। রাজনৈতিক তর্জা ও দোষারোপের পালা দূরে সরিয়ে রেখে, প্রশাসনকে এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করতে হবে। যাঁদের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম পুনরায় তালিকায় তোলার জন্য প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে বিশেষ ক্যাম্প তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষকে আইনি ও প্রশাসনিক সাহায্য দেওয়ার জন্য প্রতিটি ব্লকে হেল্প ডেস্ক খোলা জরুরি। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশনের কাছে রাজ্য সরকারকে কড়া ভাষায় দরবার করতে হবে, যাতে এই মানুষগুলো বিনা শর্তে তাঁদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পান।
পরিশেষে বলা যায়, নাগরিকত্ব একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনও প্রশাসনিক গাফিলতি বা যান্ত্রিক ত্রুটির জেরে একজন সাধারণ মানুষকেও তাঁর নিজের দেশে পরবাসী করে তোলা যায় না। এসআইআর-এর এই চূড়ান্ত তালিকা শুধু একটি খসড়া বা পরিসংখ্যান নয়, এটি লক্ষ লক্ষ পরিবারের বিনিদ্ররজনীর কারণ। রাজ্য প্রশাসন যদি এখনই সহানুভূতিশীল হয়ে সঠিক পদক্ষেপ না করে, তবে এই আতঙ্ক অচিরেই এক বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেবে। সাধারণ মানুষের এই অসহায়তার দায় প্রশাসনকে নিতেই হবে এবং এর দ্রুত সমাধান করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
(লেখক প্রাবন্ধিক। বালুরঘাটের বাসিন্দা।)

