সুপ্রিম কোর্টে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) (SIR) মামলায় সওয়াল করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। এবার সেই এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে ফের রাজপথে তিনি। ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে তাঁর অবস্থান-বিক্ষোভ শুরু হবে শুক্রবার। রাজ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ নাম বাদ পড়ায় অবশ্য শুধু তৃণমূল নয়, বিজেপি বাদে অন্যান্য দলও ক্ষুব্ধ।
খসড়া ভোটার তালিকায় বাদ গিয়েছিল ৫৮ লক্ষ নাম। তারপর শুনানিতে গরহাজিরার কারণে বাদ গিয়েছে আরও পাঁচ লক্ষ। এখনও পর্যন্ত বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ৬৩ লক্ষের বেশি। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত এগারোটা পর্যন্ত যাঁদের যুক্তিগ্রাহ্য অসংগতির অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের ঠাঁই হয়েছে চূড়ান্ত তালিকায়। যাঁদের হয়নি, তাঁদের সংখ্যা ৬০ লক্ষের বেশি। এঁরা সকলেই বিবেচনাধীন।
এই ৬০ লক্ষের ভবিষ্যৎ এখনও ঝুলে আছে। যদি এই ৬০ লক্ষও বাদ যায়, তাহলে বাংলায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ২৩ লক্ষ। বাংলায় এসআইআর শুরুর আগে থেকেই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে ভোটার বাদের সম্ভাব্য সংখ্যাটা মোটামুটি এরকম বলছিলেন। এখানেই প্রশ্ন তুলছে তৃণমূল নেতৃত্ব। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) বলেছেন, ‘শুনানি পর্বের শেষদিকে শোনা গেল, বিবেচনাধীন কেস-এর সংখ্যা ১৫ লক্ষ। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে, সংখ্যাটা ৬০ লক্ষের মতো।’
তৃণমূলের অভিযোগ, তালিকার পরতে পরতে ধাপ্পাবাজি আছে। বঙ্গ বিজেপি-র নেতারা অবশ্য বলতে শুরু করেছেন, তৃণমূল বুঝতে পারছে, এবার পরাজয় নিশ্চিত। তাই মুখ্যমন্ত্রী ভয় পেয়ে ধর্মতলায় ধর্না-অবস্থানে বসছেন। রাজ্যবাসীর একাংশের একই অনুমান। তাঁদের ধারণা, মুখ্যমন্ত্রী সত্যিই আতঙ্কে। তাঁর কেন্দ্র ভবানীপুরেই ৪০ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।
বাস্তবে ভোটার বাদ পড়েছে মূলত ভবানীপুরের বিজেপি প্রভাবিত ওয়ার্ডগুলিতে। তবু মুখ্যমন্ত্রী চিন্তিত, পাছে ২০২১-এর নন্দীগ্রাম কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না হয়। বাস্তবে এই মুহূর্তে অবশ্য বাংলায় ঘাসফুলের নির্বাচনি সাফল্যের সম্ভাবনা এমন কিছু খারাপ নয়। আরজি কর মেডিকেলে খুন-ধর্ষণ, সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজ, দুর্গাপুরের বেসরকারি মেডিকেল কলেজে একের পর এক ধর্ষণ-খুন, গণধর্ষণের অভিযোগের সময় রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের জনপ্রিয়তা সত্যিই তলানিতে ঠেকেছিল।
বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে তৃণমূল বিরোধিতার হাওয়া দেখা গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একদিকে রাজ্য বিজেপির ছন্নছাড়া পরিস্থিতি, অন্যদিকে তৃণমূল সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা ৫০০ টাকা বৃদ্ধি এবং নতুন যুবসাথী প্রকল্পে অন্তত মাধ্যমিক পাশ বেকারদের ১৫০০ টাকা ভাতা চালু জোড়াফুলের ‘টিআরপি’ যেন হঠাৎ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মমতা ইতিমধ্যে বুঝে গিয়েছেন, তাঁর চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথগ্রহণ শুধু সময়ের অপেক্ষা। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আবার ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে তিনি ধর্নায় বসবেন কেন? এই প্রতিবাদ কর্মসূচির কারণ কী? বঙ্গে গেরুয়া শিবির এমনিতেই কিছুটা কোণঠাসা। রাজ্য বিজেপিকে আরও চাপে ফেলতে ভোট ঘোষণার আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এমন আন্দোলন কর্মসূচি বলে মনে করা যেতেই পারে।
বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা ৫০-এর নীচে নামিয়ে আনতে মমতা-অভিষেক উঠেপড়ে লেগেছেন। প্রকাশ্যেও সেটা দাবি করছেন। সেই দাবি বাস্তবের মুখ দেখবে কি না, পরের কথা। আপাতত অন্য একটা বিষয় বলার। এমনিতেই যানজট সমস্যায় জেরবার থাকে মধ্য ও উত্তর কলকাতা। ভরদুপুরে ধর্মতলা চত্বরে যানজট হলে তার ধাক্কায় গোটা মধ্য ও উত্তর কলকাতা স্তব্ধ হয়ে যায়।
এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় মুখ্যমন্ত্রী ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে অবস্থানে বসলে বিশাল জমায়েত হওয়ার সম্ভাবনা। তার জেরে অচল হয়ে যেতে পারে কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা। রাজ্য প্রশাসনের প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী সেই বিষয়টি নিশ্চয়ই মাথায় রাখবেন। কলকাতার জনজীবন সচল রাখা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

