উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: হাঁটুব্যথা এমন একটি সমস্যা যা বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে। অনেকের ক্ষেত্রে, এটি দৈনন্দিন কাজকর্মকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করতে পারে এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারি (Knee Replacement) সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনায় অর্থোপেডিক এবং স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মৃত্যুঞ্জয় রায়
সম্পূর্ণ হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারি এমন একটি শল্য চিকিৎসা যেখানে সার্জন কৃত্রিম পদার্থ বা একটি ইমপ্ল্যান্টের সাহায্যে হাঁটুর জয়েন্ট গঠন করেন। অনেকেই ভাবেন, জয়েন্ট গঠনে হাড়ের অংশগুলি সরানো হয়, যা একেবারে ভুল ধারণা। বরং ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি কেটে ফেলা হয় এবং হাড়ের শেষ প্রান্তে কৃত্রিম উপাদান যুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতিকে হাঁটু রিসার্ফেসিং অপারেশনও বলা যেতে পারে।


অস্টিওআরথ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের জয়েন্টে ব্যথা এবং অক্ষমতা দূর করতে এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস, ট্রমা বা আঘাতের ক্ষেত্রে এটি হাঁটুর কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে।
অন্যদিকে, আংশিক হাঁটু প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হাঁটুতেই শল্য চিকিৎসা করা হয়। সাধারণত কমবয়সি রোগীদের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।
হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারি কখন করাবেন
১) ক্রমাগত ব্যথা – দীর্ঘস্থায়ী হাঁটুব্যথা প্রায়শই অন্তর্নিহিত গুরুতর সমস্যার প্রথম বা প্রাথমিক লক্ষণ। যদি আপনার ক্রমাগত ব্যথা হতে থাকে এবং তা বিশ্রাম বা ফিজিওথেরাপি নিলে কিংবা ওষুধ খাওয়ার পরেও না কমলে সতর্ক হতে হবে। এই ধরনের ব্যথা তীব্র হয় এবং হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বা দীর্ঘসময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে অবস্থা আরও খারাপ হয়।
২) সক্রিয়তা কমলে – হাঁটু শক্ত হয়ে যাওয়া, হাঁটু বাঁকানো বা সোজা করতে অসুবিধা হলে, দীর্ঘ দূরত্ব হাঁটতে না পারলে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হলে বুঝতে হবে সক্রিয়তা কমছে। সেক্ষেত্রে হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
৩) ফোলাভাব ও প্রদাহ হলে – হাঁটুর জয়েন্টে ফোলাভাব এবং প্রদাহ বিভিন্ন অবস্থার ইঙ্গিত দিতে পারে, যার মধ্যে আরথ্রাইটিস বা আঘাত অন্তর্ভুক্ত। যদি আপনি লক্ষ করেন, আপনার হাঁটু ঘনঘন ফুলে যাচ্ছে, বিশেষ করে কাজের পরে, তাহলে এটি জয়েন্টের অবনতির লক্ষণ হতে পারে।
৪) অস্থিরতা এবং দুর্বলতা – এটি এমন এক অবস্থা যাতে হাঁটা, দৌড়ানো বা খেলাধুলোয় অংশগ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই লক্ষণের সঙ্গে প্রায়শই হাঁটুর জয়েন্টে দুর্বলতার অনুভূতি হতে পারে।
৫) চিরাচরিত চিকিৎসা ব্যর্থ হলে – অনেক রোগী হাঁটুব্যথার জন্য চিরাচরিত চিকিৎসা করিয়ে থাকেন, যেমন – ফিজিওথেরাপি, ওষুধ, কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন নেওয়া প্রভৃতি। এছাড়া জীবনযাত্রার পরিবর্তন তো রয়েইছে। যদি এসব করেও কোনও উন্নতি না হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আরও ব্যাপক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন।
প্রতিস্থাপনের পদ্ধতি
- এক্ষেত্রে সাধারণ অ্যানাস্থিশিয়ার সাহায্য নেওয়া হয়।
- এরপর হাঁটুর সামনের অংশে ত্বকে একটি ছেদ করা হয় যা প্যাটেলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তারপর প্যাটেলাটিকে বাইরের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয় যাতে ভেতরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভালোভাবে দেখা যায়।
- ফিমারের নীচের প্রান্তটি (ঊরুর হাড়) পরে পরিমাপ করা হয় এবং পুনরুত্থিত করা হয়। হাড় এবং কার্টিলেজের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে ফিমারের নীচের প্রান্ত থেকে কেটে বাদ দেওয়া হয় এবং তারপরে কৃত্রিম হাঁটুর ধাতব ফিমোরাল উপাদানটি ফিট হয়।
- টিবিয়ার উপরের প্রান্ত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হাড় এবং কার্টিলেজকে সরিয়ে প্লাস্টিক বা ধাতব টিবিয়াল উপাদানটিকে ফিট করার জন্য পুনরায় আকার দেওয়া হয়।
- প্যাটেলার পুনরায় আকার দেওয়ার পর ঘর্ষণ এড়াতে সার্জন ফিমোরাল এবং টিবিয়াল উপাদানগুলির মধ্যে একটি প্লাস্টিকের স্পেসার যুক্ত করেন।
- সাধারণত কৃত্রিম অংশটি হাড়ের সঙ্গে সার্জিক্যাল সিমেন্ট দ্বারা যুক্ত করা হয় এবং এটি সিমেন্টেড প্রস্থেসিস নামেও পরিচিত।
- ইমপ্ল্যান্টের কার্যকারিতা হাঁটু বাঁকিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং হাঁটুর সামনের অংশে করা ছেদটি সেলাই করে অথবা সার্জিকাল স্ট্যাপল দিয়ে বন্ধ করা হয়।
এই পাঁচটা পয়েন্ট আলাদা বক্স করে বসাতে হবে
১) হাঁটু প্রতিস্থাপনের আগে চিকিৎসক কয়েকটি পদ্ধতি বলে থাকেন। যেমন- ফিজিওথেরাপি, ওজন কমানো, জয়েন্টের প্রদাহ কমাতে ওষুধ, কার্টিলেজ মেরামতের সেপ্লিমেন্ট এবং আকুপ্রেশার। এইসব উপায় কাজে না এলে তখনই অস্ত্রোপচার করা হয়।
২) এই ধরনের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে।
৩) অস্ত্রোপচারের পরের দিন থেকেই ব্যথা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যে ব্যথা একেবারে কমে যাবে।
৪) সঠিকভাবে হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হলে তা ২০ থেকে ২৫ বছর কার্যকারিতা দেয়।
৫) সাধারণত অস্ত্রোপচারের ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যেই ক্রাচ নিয়ে রোগীকে হাঁটানো হয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ব্যায়াম এবং শরীরচর্চার মাধ্যমে শীঘ্রই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব।

