বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬

দুই বাংলার দুই আন্দোলন যখন আলো থেকে আঁধারে

শেষ আপডেট:

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

বিদ্বেষের বাংলাদেশের কাগজে ক’দিন আগে দেখলাম শিরোনাম– ভারত তুমি রিয়ালিটি মাইন্যে নাও।

আরেকটা শিরোনাম– ভারতের কথা ও আচরণে মিল থাকতে হবে।

রিয়ালিটি মাইন্যে নাও মানে কী? আসলে বাস্তব মেনে নিতে বলা। কথা ও আচরণের ব্যাপারটা? আসলে কথায় ও কাজে মিল নেই।

ঢাকা বলতেই পারে, ভারতের অন্দরে সংখ্যালঘুদের উপর কি অত্যাচার হচ্ছে না? উত্তরপ্রদেশ, মুম্বই, হরিয়ানা, নয়াদিল্লি থেকে মুসলমানদের হেনস্তার কত খবর আসে! যোগী জমানায় তো বহু শহরের নাম বদলাল মুসলিম স্পর্শ থাকায়। কে দিব্যি দিল অন্য দেশ নিয়ে ভাবতে?

ভারতের অনেকে বোঝাতে চাইছেন, ৫৪ বছর আগে বাংলাদেশের যুদ্ধে আমরা কত সাহায্য করেছিলাম। ওপার বাংলা কি সব ভুলে গেল? ভারতে আর যাই হোক, সংখ্যালঘুদের প্রাণভয়ে কাঁটাতার পেরিয়ে, নদী সাঁতরে অন্য দেশে পালাতে হয় না এখনও। বিশৃঙ্খলার বাংলাদেশে যা নিয়মিত ছবি আজ।

পরিবর্তিত সমাজে হয়তো প্রসঙ্গটা অর্থহীন।

এখন অত বছর আগের উপকার মনে রাখার দিন শেষ। এখন প্রচুর ছেলেমেয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় বাবা-মাকেই। সব জলভাত। কেউ কিছু মনে রাখে না। আপনি একজনের দশটা উপকার করলেন, একটা কাজ করতে পারলেন না। লোকে ওটাই বলবে, ভুলে যাবে ন’টা উপকার। ব্রিটিশরা আমাদের ওপর ২৫০ বছরের বেশি অত্যাচার চালিয়েছে বলে কি ভারতীয়রা বিলেতে চাকরি করতে যায় না? স্থায়ী বাসিন্দা হয় না? বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের বয়ে গিয়েছে ভারতের অবদান মনে রাখতে। এত পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটার দিন শেষ।

এখন যা অবস্থা, তাতে অনেক কিছুই বুদ্ধি দিয়ে মেলানো যায় না।

নইলে ভাবা যায়, জয় বাংলা স্লোগান লেখা বা বলার জন্য খুন করা হচ্ছে বাংলাদেশে?

ঢাকার কিছু সংবাদমাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বোঝাতে টানা হচ্ছে ১৭৯৮ সালে লর্ড ওয়েলেসলির ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ নীতির কথা। যখন বাংলার নবাব-জমিদাররা কার্যত মনিব-ভৃত্য চুক্তি করেন ব্রিটিশদের সঙ্গে। বন্ধু নয়, ভারতও নাকি সেভাবে নিজেদের প্রভু ভাবতে চায়।

দেশ বড় হতে থাকলে পাশের ছোট দেশ সব সময় সন্ত্রস্ত থাকে। সবক্ষেত্রে দাদাগিরি দেখবে কারণে-অকারণে। এটা কিছু ক্ষেত্রে সত্যি, আবার কিছু ক্ষেত্রে কাজ করে ছোট দেশের হীনমন্যতাবোধ। আমেরিকার ক্ষেত্রে মেক্সিকো, চিনের ক্ষেত্রে তাইওয়ান, রাশিয়ার ক্ষেত্রে ইউক্রেন। বাংলাদেশও ভারতের দাদাগিরি দেখছে। কোনও সময় কিছু ক্ষেত্রে যুক্তি থাকে, কোনও সময় থাকে না। পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার ব্যাপারেও এক কথা।

যে কারণে পদ্মাপারে বলা হচ্ছে, ভারত আমাদের বন্ধু ভাবে না। গোলাম ভাবে। বন্ধুত্ব আসলে ছিল হাসিনা-মোদির, দুই দেশের নয়। যে কারণে ওপারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সটান বলে দেন, ‘আমরা প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু খবরদারি নয়।’

ওই যে বলছিলাম, আজকাল অনেক কিছুই বুদ্ধি দিয়ে মেলানো যায় না।

কলকাতার ডাক্তারদের বুধবারের নির্বাচনের গল্পেও লেগে আছে এমন বিস্ময়। যে ডাক্তাররা আন্দোলন করে প্রচারমাধ্যমের হিরের টুকরো ছেলে হয়ে রইলেন, তাঁরা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে একেবারে দশ গোল খেলেন কেন? ডাক্তারদের মধ্যেই তাঁরা জনপ্রিয় নন। ডাক্তাররাই তাঁদের ওপর অসন্তুষ্ট। ডাক্তারদের বিদ্রোহী অংশ আমাদের বিশ্বাস করতে শেখালেন, তৃণমূলের রাজত্বে স্বাস্থ্যে ব্যাপক দুর্নীতি চলছে। প্রতিবাদ হল কোথায়? ডাক্তাররা নিজেরাই তো বিপুল ভোটে জিতিয়ে আনলেন তৃণমূলের নেতাদের।

বারবার জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে একটা প্রশ্ন। ডাক্তারদের এত রাজনীতি করার কী দরকার? ভালো ডাক্তাররা কি ডাক্তারির বাইরে অন্য কিছু করার সময় পান? এত রাজনীতি করা কীসের জন্যে? আর সবার মতো ডাক্তারদের রাজনীতি করার অধিকার আছে অবশ্যই। অথচ রাজনীতি যদি করা হয় নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরির জন্য, তাহলে তা চরম অন্যায়। আজকের অধিকাংশ মানুষের রাজনীতিতে মিশে থাকে চরম অসততা, টাকা কামাইয়ের অঙ্ক। ডাক্তারদেরও বিশ্রী খেরোর পাতায় নাম লেখানো কি খুব জরুরি?

ডাক্তারদের আন্দোলনের উজ্জ্বল দিক যেমন আমরা দেখলাম, তেমন আবেগ থিতিয়ে এলে দেখা গেল কালো দিকও। বহু আন্দোলনকারীর মোটিভ নিয়েই প্রশ্ন থাকছে অনেক।

আমরা দেখলাম, ক্রাউড ফান্ডিংয়ে প্রচুর টাকা তোলা হল। কেউ কেউ প্রচার কাজে লাগালেন। মডেল হয়ে বিজ্ঞাপনে নামলেন। আমরা দেখলাম, মৃত ডাক্তারের সহপাঠীরা কেউ কোনও নির্দিষ্ট ক্লু দিতে পারলেন না হত্যাকারীদের নিয়ে। আমরা দেখলাম, পোস্টমর্টেমে সই করা অনেক ডাক্তার আন্দোলনে মিশে গিয়েছেন। আমরা দেখলাম, এঁরা শিরদাঁড়া শিরদাঁড়া করে বাজার মাতালেন, লালবাজারে কমিশনারের টেবিলে পর্যন্ত রেখে এলেন প্লাস্টিকের শিরদাঁড়া। পরবর্তীতে তাঁদের কার্যকলাপ দেখাল, এঁদেরই অনেকের শিরদাঁড়া নেই। তাঁদেরও টেবিলে শিরদাঁড়া রেখে আসা উচিত।

যে সব সাধারণ মানুষ তাঁদের ওপর আস্থা রেখে নিয়মিত খাবার দিয়ে গেলেন, মঞ্চ ভরাতে গেলেন, তাঁদের বিশ্বাসের প্রতি অত্যন্ত অবমাননা হল।

অবশ্যই কলকাতায় ডাক্তারদের আন্দোলন নতুন আলো জ্বালিয়েছিল সমাজে। পুরো বাংলায় নয়, কলকাতাভিত্তিক। পরবর্তীতে যা হল, ভবিষ্যতের আন্দোলনকারীদের পক্ষে খুব খারাপ। কেউ আর দ্রুত প্রতিবাদীদের বিশ্বাস করবে না। যেমন বাংলাদেশে কোনও আন্দোলনই মানুষের হৃদয়ের স্পর্শ পাবে না আর। যেখানে জয় বাংলা বলতে গেলে, জয় বাংলা লিখতে গেলে মানুষ খুন হয়ে যায়– সেখানে আন্দোলনকে বিশ্বাস করবে কে?

খুব অল্প সময়ের মধ্যে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আমরা দেখলাম দুটো আন্দোলনের জন্ম। শিহরিত হলাম। অজান্তে মন দিয়ে ফেললাম তারুণ্যের সাহসে, দীপ্ত কথায়। এবং ক’দিনের মধ্যে দেখলাম, ধীরে ধীরে পালটে গেল আন্দোলনের গতিমুখ। কেউ মৌলবাদ ও রক্তকে ভালোবাসতে থাকল, কেউ ভালোবাসতে লাগল প্রচার ও মিথ্যা ভাষণকে। কেউ বোড়ে হয়ে উঠল নেতাদের, পার্টির। উদারতা এবং সবাইকে নিয়ে চলার ভাবনাই মুছে যেতে থাকল ক্রমে। ও অন্য পার্টির সমর্থক, ও তা হলে আমার শত্রু– এমন ভাবনা আচ্ছন্ন করে দিল আমাদের বিবেককে। আন্দোলন শব্দটা হয়ে উঠল অঙ্ক কষার প্রতীক।

এই পরিবর্তনই বড় বেদনার, যন্ত্রণার। আমরা যে তাঁদের অন্যরকম দেবদূত ভেবেছিলাম!

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

এসআইআর এখন যোগীর গলার কাঁটা

 আশিস ঘোষ নেহাত তিনি মুণ্ডিতমস্তক। নইলে এই প্রবল শীতে...

তৃণমূলের অন্দরমহলে আইপ্যাকের বিষ

শুভঙ্কর চক্রবর্তী সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (CM Mamata Banerjee)...

চিত্রনাট্য বদল ছাড়া আর উপায় ছিল না যে

গৌতম সরকার পিঠেপার্বণের মাস। মেলার-খেলার মাস। ‘ঘরেতে যে আজ কে...

মৌসম চলে যায় অজান্তে, জানেন না মৌসম!

রূপায়ণ ভট্টাচার্য শূন্য প্লাস শূন্য করলে কী হয়? কী হয়...