ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচের মতোই নাটকীয় উপাদানে ভরপুর দু’দেশের সামরিক সংঘর্ষ পর্বও। লড়াই শুরুর সাড়ে তিনদিনের মাথায় মার্কিন মধ্যস্থতায় হঠাৎই সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রয়াসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি-ইসলামাবাদ। দুই দেশকেই অভিনন্দন জানিয়েছেন ট্রাম্প। তারপর ঘণ্টাদুয়েকও যায়নি, ফের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পাক বাহিনীর গুলিগোলা, ড্রোন হানা শুরু হল রাজৌরি-আখনুর-আর পুরা-বদগাম-বারামুল্লায়। ব্ল্যাক আউট গোটা কাশ্মীরে। পাকিস্তান তার বিশ্বাসযোগ্যতাই হারিয়েছে, আবারও প্রমাণিত হল।
১৯৪৭ থেকে এযাবৎ পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের তিনবার যুদ্ধ হয়েছে। ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১। ১৯৯৯-এ কার্গিলে ভারত-পাক লড়াই ছিল তুলনায় সীমিত। ২৬ বছর পর আবার সম্মুখসমরে দু’পক্ষ। ২২ এপ্রিলের পহলগাম কাণ্ডে ২৬ জন খুনের পালটা ৭ মে ভোররাতে পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হানা চালিয়ে ন’টি জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংস করেছে ভারতীয় সেনা-বায়ুসেনা। এর মধ্যে লস্কর-জইশ-হিজবুল্লার ঘাঁটিও ছিল। পাক আকাশসীমা লঙ্ঘন না করে ভারতীয় বাহিনীর ‘অপারেশন সিঁদুর’ প্রথম পর্বে পাকিস্তানের সেনাঘাঁটি বা পাক সামরিক পরিকাঠামোর কিন্তু কোনও ক্ষতি করা হয়নি। অন্যদিকে, পাকিস্তান ভারতের পনেরোটি শহরের সেনাছাউনিতে আক্রমণের চেষ্টা চালায়। সবক্ষেত্রেই পাক চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে ভারত। পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরেও সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংসে নেমে পড়ে ভারতীয় বাহিনী। পাক সেনার রাডারের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ধ্বংস করে দেয়। সেই রাতে জম্মু-কাশ্মীর, পঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাট সহ বহু রাজ্যের ৩৬ শহরে সেনাঘাঁটি ও জনপদ লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে থাকে পাক সেনা। কিন্তু ভারত এস ৪০০ আকাশ-প্রতিরোধী ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিটি আক্রমণেরই মোকাবিলা করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রকের খবর, পাকিস্তানের দুটি এফ ১৬ যুদ্ধবিমানকেও গুলি করে নামানো হয়েছে। শনিবার সকালে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের সামরিক পরিকাঠামোকে আরও ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ধ্বংস করে দেয় পাক সেনার অন্তত আটটি বিমানঘাঁটি।
দুপুর পর্যন্ত মোটামুটি এটাই ছিল সংঘর্ষের চিত্র। আচমকাই বিকেলে আসে সংঘর্ষ বিরতির খবর। পাকিস্তানের ডিজিএমও মেজর জেনারেল কাশিফ আবদুল্লা তাঁর ভারতীয় প্রতিপক্ষ লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব ঘাইকে ফোন করেন। তারপরেই দু’পক্ষ সংঘর্ষ বিরতিতে রাজি হয়। কিন্তু প্রদীপ জ্বালানোর আগে থাকে সলতে পাকানোর পর্ব। পাক উপপ্রধানমন্ত্রী ইশাক দার জানিয়েছেন, ভারত-পাক সংঘর্ষ থামাতে আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, চিন, সৌদি আরব, তুরস্ক সহ ৩৬টি দেশ উদ্যোগী হয়েছিল। মার্কিন সময় অনুযায়ী শুক্রবার সারারাত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স এবং বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো ভারত-পাক উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন। তার আগে নরেন্দ্র মোদি, জয়শংকর, অজিত দোভালের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তাঁরা। বস্তুত সংঘর্ষ বিরতির ঘোষণার অব্যবহিত আগেই ভারতের তরফে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, এখন থেকে ভারত যে কোনও ধরনের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা বলেই গণ্য করবে। সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রচার হতে না হতেই ওয়াশিংটন থেকে সংঘর্ষ বিরতির খবর। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সেনাবাহিনীর তিন আধিকারিক। সোফিয়া কুরেশি, রঘু নায়ার, ব্যোমিকা সিং। যতদূর খবর, সংঘর্ষ শুরুর আগে ভারত সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখা সমেত যেসব ব্যবস্থা নিয়েছিল, সেগুলি যথারীতি বহাল থাকবে। অন্যদিকে, পাকিস্তানি বাহিনী সংবাদমাধ্যমের সামনে তাদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তুলে ধরে।
এই সব পর্ব চলতে চলতেই অন্ধকার নামতেই কাশ্মীর সীমান্তে পাক সেনার নতুন করে ড্রোন হামলার খবর আসতে থাকে। ১৯৪৭ থেকেই দশকের পর দশক সেই একই কাণ্ড। সংঘর্ষ বিরতির পরেও পাক তাণ্ডব প্রমাণ করল, সাধারণ সেনারা সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। প্রশ্ন একটাই, পাকিস্তান আর কবে ‘গুড বয়’ হবে?



