রাজনীতিতে অবসর

শেষ আপডেট:

সমস্ত শুরুর একটা শেষ থাকে। অনন্তকাল ধরে সবকিছু একইভাবে চলতে পারে না। রাজনীতির ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যাপারটা খানিকটা আলাদা। অন্তত ভারতে। এদেশের রাজনীতিবিদদের একটা বড় অংশের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে তাঁদের প্রয়াণে। অর্থাৎ আমৃত্যু এদেশের নেতাদের বড় অংশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকেন।

অন্যান্য পেশায় অবসরের বয়সসীমা থাকলেও রাজনীতিতে তেমনটা নেই এখনও। এই প্রেক্ষাপটে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের ৭৫ বছরে অবসর নেওয়ার তত্ত্ব তাৎপর্যপূর্ণ। এতে মোদি জমানার শুরুতে বিজেপিতে চালু অলিখিত নিয়মে সিলমোহর পড়বে কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলীমনোহর যোশিদের মার্গদর্শক মণ্ডলে পাঠিয়ে দিয়েছিল বিজেপি।

৭৫ বছর বয়স হলেই বিজেপি নেতাদের বানপ্রস্থে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বলে জল্পনা শুরু হয়েছিল তখনই। এবার সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিলেন খোদ সরসংঘচালক। সম্প্রতি তিনি নাগপুরে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, আপনার বয়স ৭৫ হওয়ার অর্থ এবার আপনাকে থামতে হবে এবং অন্যদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে। তাঁর এই মন্তব্যে ইঙ্গিত মোদির দিকে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।

তবে বিরোধীরা ভাগবতের মন্তব্যকে হাতিয়ার করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। শুধু মোদি নন, ভাগবতও ৭৫-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বলে কংগ্রেস স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর ভাগবতের ৭৫ বছর বয়স হবে। তার ঠিক ৬ দিন পর মোদির বয়স ৭৫ পূর্ণ হবে। বিরোধীরা তাই প্রচার শুরু করেছে, ৭৫ হওয়ার পরেও মোদি প্রধানমন্ত্রিত্ব না ছাড়লে ধরে নিতে হবে, তিনি পদের মোহ থেকে মুক্ত নন।

রাজনীতি থেকে পাকাপাকি অবসরের বাঁধাধরা নিয়ম ভারত কেন, বিশ্বের কোনও দেশে নেই। কেউ শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে তাঁর রাজনীতিতে থাকতে কোনও বাধা নেই। ভারতের চার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ৯২, অটলবিহারী বাজপেয়ী ৮১, চন্দ্রশেখর ৮০, ভিপি সিং ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসু ও সিদ্ধার্থশংকর রায় যথাক্রমে ৮৬ ও ৭৭ বছর বয়সে সক্রিয় রাজনীতিকে বিদায় জানিয়েছিলেন।

৯২ বছরের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবেগৌড়া ও ৮৪ বছরের এনসিপি (এসপি) সুপ্রিমো শারদ পাওয়ার এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়। কাজেই মোদির বয়স ৭৫ বছর পার হলেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা কিছু নেই। তিনি সংঘ প্রধানের বার্তায় কিংবা বিজেপির অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনায় যদি তেমন পদক্ষেপ করেন, প্রধানমন্ত্রিত্বের ব্যাটন মাঝপথে অন্য কারও হাতে তুলে দেন, তাহলে সেটা স্বতন্ত্র বিষয় হবে।

সেই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত কখনও নিয়ম হতে পারে না। কাউকে তার জন্য বাধ্য করা যায় না। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা অবসর পরবর্তী জীবনে কীভাবে কাটাবেন, তার আভাস দিয়েছেন। তিনি নাকি রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পর জৈব চাষবাসের পাশাপাশি বেদ, উপনিষদ পড়ে সময় কাটাবেন। তবে তিনি কবে অবসর নেবেন, সেটা খোলসা করেননি।

স্বাধীন দেশে সব নাগরিকের স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। অমিত শা কীভাবে বানপ্রস্থ পর্ব কাটাবেন, সেটাও তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তবে একই সময়ে ভাগবতের ৭৫ বছরে অবসরের বার্তা আর শা’র অবসর যাপনের চিন্তাভাবনার প্রকাশ কাকতালীয় নাও হতে পারে। আরএসএস-বিজেপি যদি অন্যান্য পেশার মতো রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তির সময়সীমা বেঁধে ফেলে, তাহলে ভারতের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেবে।

বিজেপি যদি সত্যিই ৭৫ বছরে রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেওয়াকে বাধ্যতামূলক করে দেয়, তাহলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলির ওপর সেই লাইন বিবেচনা করার চাপ বাড়বে নিশ্চয়ই।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

পাহাড়ে মেঘ

গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার ঘাড়ে সওয়াল হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বপ্ন...

বিষম ফাঁপরে

প্রসঙ্গটি শমীক ভট্টাচার্য উত্থাপন করেছেন বলে নয়। প্রশ্নটি উঠতেই...

জ্বালানিসংকট

অবশেষে যেমন আশঙ্কা করা গিয়েছিল তেমনটাই হয়েছে। পাঁচ রাজ্যে...

অনিশ্চিত নাগরিকত্ব

সম্ভাবনা সত্যি হতে চলেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীকে...