- মৌমিতা আলম
যে কোনও পাহাড়ের মূল শহর ছাড়িয়ে একটু বাইরে বেরোলেই শহর গিলে ফেলা কোলাহল ফিকে হয়ে আসে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায় জড়ানো আদিম অকৃত্রিম গন্ধে নিজেদের ময়লা জমা মনের আভরণের স্তর খুলে পড়ে একটু একটু করে। দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের বুকে এক খণ্ড সাদা মেঘ যেমন হাঁসের মতো চরে, সেরকমই মন ভেসে বেড়াতে চায় দিগন্তে।
শিলং থেকে মেঘালয় ট্যুরিজমের বাস চেরাপুঞ্জির দিকে রওনা দিল। শহর পেরিয়ে ছোট ছোট গ্রাম পেরোচ্ছি এক-এক করে। কিন্তু কিছুতেই যেন সেই আদিম গন্ধ আর নিস্তব্ধতা নেই। বরং তখন মেঘালয় যেন বেশ রুক্ষ, ভীষণরকম অসহ্য। চারিদিকে শুধুই বড় বড় গর্ত। বুলডোজার বড় বড় দৈত্যাকার হাত আর দাঁত দিয়ে খুবলে খুবলে তুলছে পাহাড়ের পেট থেকে বড় পাথর, বালি আর মাটি।
বুলডোজার দেখলেই কেমন জানি অস্বস্তি হয়। এক অপরাজেয় শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দুর্বলতার আশ্বাস। মনে পড়ে এনআরসি-বিরোধী আন্দোলনের মুখ আফরিন ফাতিমার বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে বহুতল বাড়িটি। কিংবা বুলডোজারের সামনে হাত উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া ৭৪ বছর বয়সি বৃন্দা কারাত। কোর্টের অর্ডার সত্ত্বেও সেদিন নয়াদিল্লির জাহাঙ্গিরপুরী এলাকায় বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হচ্ছিল দাঙ্গায় অভিযুক্তদের বস্তি বাড়ি। বৃন্দা আর বেশ কিছু আইনজীবীর তৎপরতায় সেদিন বেঁচে যায় সারাজীবনের মাথার ঠাঁই সেই বাড়িগুলি।
এই দাঁত খিঁচিয়ে বাড়ি ভাঙতে আসা বুলডোজারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি শব্দ – জাস্টিস। বুলডোজার জাস্টিস বা বুলডোজারের মাধ্যমে ন্যায় সাম্প্রতিককালে চালু হওয়া একটা শব্দবন্ধ। দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু হয় ২০১৭ সালে প্রথম উত্তরপ্রদেশে। আর আমরা সকলেই জানি অভিযোগ আর প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে থাকে রাজনৈতিক সমীকরণ, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যায় শাসকের পক্ষে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০২০ সালের মধ্যেই অপরাধী বিকাশ দুবে, রাজনীতিক ও গ্যাংস্টার মুখতার আব্বাস ও আতিক আহমেদের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেন। একে একে দাঙ্গায় অভিযুক্ত থাকলেই বাড়ি ভেঙে দেওয়া শুরু হয় মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ডেও। বুলডোজার জাস্টিস যা আদতে চরম প্রতিশোধস্পৃহার প্রতিফলন ও আস্ফালন, তা অচিরেই স্বাভাবিক মনে হতে থাকে বাড়তে থাকা ঘৃণার আবহে।
ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন হচ্ছে বলে ১৩ নভেম্বর, ২০২৪, বিচারপতি গাভাই এবং কেবি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি উপযুক্ত প্রক্রিয়া না মেনে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া অসাংবিধানিক। এই রায়ে অবৈধ বসবাসকারী অভিযোগে বস্তি ভাঙা সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। দেশের বিশিষ্ট পত্রিকা ফ্রন্টলাইন এক বছর সমীক্ষা চালিয়ে জানায়, ২০২৪ সালে বুলডোজার দিয়ে ভাঙা বাড়ির বেশিরভাগই অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিযোগে। বেশিরভাগ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে ‘উন্নয়ন’ নামে।
আসলে এদেশে উন্নয়ন আর সৌন্দর্যায়নের বলি হন বস্তিবাসী। যাঁদের উন্নয়নে হতে পারে দেশের উন্নয়ন, তাঁদের ছেঁটে ফেলে চলে উন্নয়নের রথ। ঘিঞ্জি, নোংরা বস্তি – উন্নয়নের অংশ হয় কেমন করে! ক্রমশ বাড়তে থাকা শ্রেণিবৈষম্যে উন্নয়ন বলতে বোঝায় বড় বাবুদের আকাশছোঁয়া বাড়ি। হাউজিং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ ও ২০২৩ এই দু’বছরেই শুধু ভেঙে ফেলা হয়েছে ১ লক্ষ ৫৩,৮২০ বাড়ি। ফলে মাথার ছাদ হারিয়েছেন প্রায় ৭ লক্ষ ৩৮, ৪৩৮ জন। এই তথ্য বলছে, যাঁদের ঘর ভাঙা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ মুসলিম, ২৩ শতাংশ আদিবাসী জনজাতি এবং ১৭ শতাংশ অনগ্রসর জনজাতির মানুষ।
কোথায় যায় এই বাস্তুহারা মানুষগুলো?
নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। যা কিছু নিতে পারে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া বাড়িগুলো থেকে, তা নিয়ে আবার কোনও ফুটপাথের কোনায় কিংবা বট গাছের নীচে কিংবা ডাম্প ইয়ার্ডে প্লাস্টিকের তলায় আশ্রয় নেবে। যতক্ষণ না আবার কোনও বুলডোজারের হাত গুঁড়িয়ে দেবে আশ্রয়। কর্তৃপক্ষ বৈধ-অবৈধ কাগজের মাঝে ঘরের উষ্ণতা বোঝে না। খরা, বন্যা, দেশভাগ, খিদে, কাঁটাতারের যন্ত্রণা কোনও কাগজে লেখাও থাকে না।
কোনও শব্দ আসে না এই ‘অবৈধ’ মানুষগুলোর অবস্থান থেকে। পুরোনো আবাসের সব স্মৃতি মুছে আবার নতুন করে ভেসে থাকতে চায়। একদিন সব হারিয়ে, সব ভুলে হয়তো তারাও সৈয়দ মুজতবা আলির গল্পের সেই চরিত্রের মতো বলবে – মা খু চিহল ও পঞ্চম হস্তম – আমি ৪৫ নম্বর কয়েদি। এই বিশাল ভূখণ্ডের ভিটেহারা কয়েদিরাও ঠিক এমন। নামঠিকানাহীন অস্তিত্ব। তাদের অস্তিত্ব ক্ষণিক সাড়া জাগালেও হারিয়ে যায় দ্রুত স্মৃতি থেকে। মনে পড়ে সেই দৃশ্য, উচ্ছেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মৃত এক ব্যক্তি, আর সেই মৃতদেহের ওপর লাফাচ্ছে এক ফোটোগ্রাফার। ২০২১ সালে, আসামের সিপাঝাড়ের ঘটনা।
এই যে দ্বেষ, যা মৃত্যুর পরেও এক মৃতদেহকে মানুষের মর্যাদা দিতে অস্বীকার করে, তা ফুলেফেঁপে বাড়ছে রাষ্ট্রীয় মদতে। জেলের নামও সংশোধনাগার। আশা করা হয়, একজন সাজাপ্রাপ্ত ক্রিমিন্যালও তাঁর ভুলের সাজা পেয়ে সংশোধিত হয়ে ফিরে আসবে মূলস্রোতে। শুধুমাত্র অভিযুক্ত বা যদি প্রমাণিত ক্রিমিন্যালও হয়, তাঁর ঘর বুলডোজার চালিয়ে তছনছ করে দিলে তার অস্তিত্ব মুছে দেওয়া হয়, মুছে ফেলা হয় তার মূলস্রোতে ফিরে আসার সমস্ত সম্ভাবনা। আর অবাক করা বিষয় হল, সেটা হয় ন্যায়ের নামে। প্রতিশোধকে যখন ন্যায়ের নামে চালানো হয়, তখন সেই ন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্র তার সমস্ত হাত দিয়ে বুলডোজার জাস্টিসের স্বাভাবিকরণ করে ফেলেছে বাড়তে থাকা ‘মব’ বা উন্মত্ত জনতার কাছে। যে জনতা ঘৃণা গিলে শুধু শত্রু খুঁজছে। সেই শত্রু কখনও প্রতিবেশী, কখনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষ। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের প্রকাশ্য জনসভায় ভক্তরা প্রায়শই হাজির হন বুলডোজারে চেপে, বাজতে থাকে ক্রমশ জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠা এইচ পপ বা হিন্দুত্ব পপ গান। বুলডোজার বাবা চাপ রহে হ্যায়, মাাফিয়া ভাগ রহে হ্যায়।
ভারতে বুলডোজারের একটা বিশাল অংশ তৈরি করে ব্রিটিশ কোম্পানি জেসিবি। জেসিবি এতটাই পরিচিত নাম এখন, যে গ্রামে মানুষ বুলডোজার না বলে জেসিবি বলে। যে জেসিবি ভাঙার মূলে, তারাই আবার সাহিত্যে অবদানের জন্য ভারতে এক সাহিত্য পুরস্কার দেয়। গতবছর একশোজনের বেশি কবি, লেখক ও সাহিত্যিক জেসিবি পুরস্কারের আয়োজকদের উদ্দেশ্যে এক খোলা চিঠি দেয়। যে চিঠিতে সই করেন বিখ্যাত কবি কে সচ্চিদানন্দন থেকে মীনা কান্ডাস্বামী সহ অনেকেই।
হাস্যকর হলেও সত্যি, যে কোম্পানি মানুষের ভিটেমাটি উচ্ছেদের জন্য দায়ী, তারাই ভারতীয় বহুত্ববাদ নিয়ে লেখা সাহিত্যের জন্য পুরস্কার দিচ্ছেন!
প্রশ্ন থেকেই যায় যে উচ্ছেদ হওয়া মানুষ সব কোথায় যায়? মনে পড়ে যাবে, বাগ্রাকোট পাহাড়জুড়ে বা তিস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বুলডোজার। তিস্তার ব্রিজে সারি বেঁধে চলা বুলডোজার দেখে মেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এত জেসিবি কোথায় যায় মা? আমি বলে ফেলেছিলাম আনমনে, উন্নয়নে।
যে উন্নয়নে শুধু উচ্ছেদ হওয়া মানুষ, গাছ, ময়ূর, হরিণ এদের জায়গা নেই। ঠাঁই নেই আট বছরের অনন্যা যাদবের। উত্তরপ্রদেশের অনন্যার বাড়ি যখন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছিল, সে সমস্ত ভয় উপেক্ষা করে ছুটে গিয়েছে তার বইয়ের ব্যাগটি নিয়ে আসতে। সে আইএএস অফিসার হয়ে দেশকে বাঁচাতে চায়। আর অনন্যাদের বাঁচাবে কে?
ওই দূরে দাঁড়িয়ে বুলডোজার।
(লেখক শিক্ষক ও সাহিত্যিক। ময়নাগুড়ির বাসিন্দা)



