আমাদের শীতকাল, নরম রোদের উল্লাস 

শেষ আপডেট:

গৌতম গুহ রায় 

শীতকাল মানেই এক অন্যরকম মাদকতা। উত্তরবঙ্গের শহর জলপাইগুড়ি থেকে কিছুটা পুবে এগোলেই তিস্তার সুবিস্তৃত চরে দেখা মেলে সেই মায়াবী শীতের। তিস্তা আর করলা নদীর মধ্যবর্তী বাঁধের রাস্তায় যখন প্রাতর্ভ্রমণকারীদের ভিড় জমে, চরের কৃষকরা পসরা নিয়ে শহরে আসেন, তখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে চারপাশ। রুপালি বালিকণার ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো রোদের স্পর্শে মুক্তোর মতো চিকচিক করে ওঠে। শীতের এই নরম রোদে ভেজা পায়ে হেঁটে চলা এক পরম বিস্ময়। ভাস্কর চক্রবর্তীর সেই অমোঘ প্রশ্ন— ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’— আজও আমাদের স্মৃতির জানলায় কড়া নাড়ে। কখনও ভোরের মেঘলা অন্ধকারে নিজের হাতের নখটুকুও দেখা যায় না, আবার কখনও একাকিত্বে ভিজে ওঠে চোখের কোণ। এ এক আশ্চর্য দৌড়, যা আমাদের ক্লান্ত করে না।

শীতের এই রূপমাধুর্য নিয়ে তর্কেরও শেষ নেই। তিস্তার জলবাষ্প মাখা সকালে কোনও এক সঙ্গিনী যখন চাদর উড়িয়ে বলে, ‘যতই তুমি শীতের রূপকথা বলো, আমার প্রিয় কিন্তু রবিঠাকুরের বর্ষা,’ তখন বোঝা যায় এটি আসলে শীতের আদুরে পরশের প্রতি এক গভীর ঈর্ষা। শীতের হাওয়া আমলকীর ডালে নাচন লাগায় ঠিকই, কিন্তু প্রবাসে থাকা বাঙালির কাছে এই ঋতু অন্য অভিজ্ঞতার। জলশহরের বন্ধু, বর্তমানে ইউরোপের চিকিৎসক সুমনের কথায় উঠে আসে ভিন্ন গোলার্ধের হাড়কাঁপানো ঠান্ডার গল্প। ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডের পথে ইংলিশ চ্যানেলের ওপর রোদ-ছায়ার খেলা দেখে যা বোঝা যায়নি, লেস্টারের রানওয়েতে নেমে সেই কনকনে হাওয়ার দাপটে তা হাড়েমজ্জায় অনুভূত হয়। গাড়ির ভেতর হিটার আর বাংলা গানের আশ্রয়ে তখন খুঁজে নিতে হয় প্রাণের আরাম।

তবে আমাদের এই তিস্তাপাড়ের শীত একেবারেই আলাদা। ডুয়ার্সের জঙ্গল আর জলহীন নদীতে এই মাঘ-ফাল্গুনের বেলা মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে তোলে। বর্ষার জঙ্গলের চেয়ে শীতের ডুয়ার্স কোনও অংশে কম রূপবান নয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির ছুটির দিনগুলো— ১ জানুয়ারি থেকে শুরু করে সরস্বতীপুজো পর্যন্ত— সবই যেন উল্লাসের উৎসব। শহরের ঝিমিয়ে থাকা পথগুলো তখন পিকনিকের ম্যাটাডোর আর লাউডস্পিকারের গানে মুখরিত হয়। রঙিন বেলুন আর নেচে ওঠা তারুণ্যের ভিড়ে শীতের বিজয় অভিযান রচিত হয়। কলোনিয়াল মাঙ্কি টুপি আর সোয়েটারের আড়ালে মানুষ তখন সান্দাকফুর তুষারপাত বা সান্তাক্লজের স্বপ্ন দেখে।

শীত যেমন হুল্লোড়ের, তেমনি এটি নিঃসঙ্গ স্মৃতিরও ঋতু। নিঝুম রাতে শৈশব বা কৈশোরের কোনও না-হারানো চাহনি মনে ভিড় করে। জয় গোস্বামীর কবিতার মতো ‘কে কার প্রণয়ে পড়ল’— সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন আজও চাঁদনি রাতে জেগে থাকে। আবার শীত মানেই তো রস আস্বাদন। নলেন গুড়ের সেই ম-ম করা গন্ধ আর মাটির কলস থেকে চুইয়ে পড়া রসের স্বাদ বাঙালির ডিএনএ-তে মিশে আছে। ঈশ্বর গুপ্তের ভাষায়, ‘দেবের দুর্লভ ধন জীবনের ঘড়া / এক বিন্দু রস খেলে বেঁচে ওঠে মড়া।’ খেজুর রসের এই মহিমা কেবল রসনাতেই নয়, সাহিত্যেও অমলিন। নতুন চালের নবান্ন আর পালাগানে মেতে ওঠে তিস্তা-তোর্ষার জনপদ। সংস্কৃত সাহিত্যের ‘রসনিষ্পত্তি’ হোক বা লোকনাট্যের আসরে সবকিছুতেই জড়িয়ে থাকে শীতকালের এক অদ্ভুত উষ্ণ পরশ। শীত আমাদের কেবল যাপনের ঋতু নয়, এ আমাদের মনের খোরাক, এক পরম প্রাপ্তি।

(লেখক সাহিত্যিক জলপাইগুড়ির বাসিন্দা)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

খাতা-ভাতার গোলকধাঁধায় বন্দি বাংলার শিক্ষা

সনাতন পাল আজকের দিনে আমাদের দেশে এবং বিশেষ করে এই...

নেপালের শিক্ষাবিপ্লব : ভারতের সামনে নতুন দিগন্ত

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী হিমালয়ের কোলে আজ এক নিঃশব্দ কিন্তু প্রলয়ংকরী...

নিরপেক্ষতার প্রতীক এক সাহসী প্রশাসক

ভোটারদের অধিকার সুরক্ষায় এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রথম নির্বাচন...

হে নূতন দেখা দিল আলোক-লগনে

বাংলাদেশে বাঙালির নববর্ষ বহু অমৃতের সন্ধান দিল। মৌলবাদীদের সক্রিয়তার...