ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণ বিলকে এক সূত্রে গেঁথে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার কৌশলে উত্তাল সংসদ।
মৌমিতা আলম
‘যখন আমার স্বামী মারা যান আমি সাহস দেখিয়েছিলাম, কিন্তু আজকে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ছি’— সংসদের কক্ষে দাঁড়িয়ে এই হাহাকার ছিল গীতা মুখোপাধ্যায়ের। নারী সংরক্ষণ বিল নিয়ে দীর্ঘ লড়াই ব্যর্থ হওয়ার পর সিপিআই নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়ের সেই অশ্রুসজল কণ্ঠ আজও ভারতীয় সংসদীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে। আজ যখন মহিলা সংরক্ষণ বিল কার্যকর করা নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল তর্জা ও চর্চা তুঙ্গে, তখন অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, এই বিল সংসদে প্রথম পেশ করেছিলেন এক বাঙালি নারী। বিড়ি শ্রমিকদের দীর্ঘ লড়াইয়ের শরিক গীতা মুখোপাধ্যায়কে শুধু লোকসভায় নারী সংরক্ষণ বিলের প্রথম উপস্থাপক হিসেবে মনে রাখলেই তাঁর প্রতি সুবিচার করা হয় না। ১৯৯৭ সালের অগাস্ট মাসের এক বিকেলে লোকসভার কার্যতালিকার ২৪ নম্বরে থাকা বিলটি নিয়ে আলোচনার জন্য বারবার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। সেদিন ঘটনাচক্রে স্পিকারের চেয়ারে বসা নীতীশ কুমার তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ৩৭৭ ধারার আলোচনা শেষ হলে বিলটি নিয়ে কথা হবে। কিন্তু ঘড়িতে তখন বেলা ৩টা ৪৬ মিনিট, ধৈর্য ও সময়ের সীমা অতিক্রান্ত। গীতা মুখোপাধ্যায় আরও পাঁচজন সাংসদকে নিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়ে কক্ষত্যাগ করেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, বিলটি নিয়ে আলোচনা না হওয়ার প্রতিবাদে তাঁরা ওয়াক-আউট করছেন। সেই মিছিলে তাঁর প্রতিবাদী সঙ্গী হয়েছিলেন আরেক বাঙালি সাংসদ প্রিয়রঞ্জন দাশমুিন্স।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে যখন পুনরায় লোকসভায় নারী সংরক্ষণ বিল পেশ করা হয়, তখন পরিস্থিতির ফেরে বিজেপির নিশিকান্ত দুবে পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিলেন বামপন্থী নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়কে এই বিলের অন্যতম রূপকার হিসেবে সম্মান জানাতে। সেই সময় আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দলের মাত্র দুজন সাংসদ ছাড়া শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষই বিলটিকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু চিত্রপট দ্রুত বদলে যায় ২০২৬ সালে এসে। যে মহুয়া মৈত্র বা কানিমোঝিরা ২০২৩-এ বিলটিকে প্রগতিশীল বলে স্বাগত জানিয়েছিলেন, ২০২৬-এ ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ হতেই তাঁরা কেন এর কট্টর বিরোধিতায় নামলেন? কেন সংসদে বিলটি আটকে গেল? এর নেপথ্যে রয়েছে ‘ডিলিমিটেশন’ বা নির্বাচন কেন্দ্রের সীমানা পুনর্নির্ধারণের এক গভীর রাজনৈতিক জটিলতা। ২০২৩ থেকে ২০২৬— এই তিন বছরে রাজনীতির অলিন্দে এমন কী ঘটল যে সমর্থকরা আজ প্রধান বিরোধী পক্ষ হয়ে দাঁড়াল? এখানেই লুকিয়ে আছে ক্ষমতার সুনিপুণ বিন্যাস এবং জনবিন্যাসের মোক্ষম চাল।
২০২৩ সালে বিলটি পাশের সময় শর্ত রাখা হয়েছিল যে, জনশুমারির পর নতুন ডিলিমিটেশন কমিশনের নজরদারিতে আসন বিন্যাস শেষ হলে তবেই ২০২৯ সালের লোকসভা থেকে এই সংরক্ষণ কার্যকর হবে। বিরোধীদের তৎক্ষণাৎ কার্যকরের দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা তখন মোক্ষম চাল চেলেছিলেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তড়িঘড়ি বিল কার্যকর হলে খোদ রাহুল গািন্ধ বা ওয়াইসির আসনও নারী সংরক্ষণের আওতায় চলে আসতে পারে। এই আশঙ্কায় তখন লোকসভা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। চাণক্য অমিত শা আসলে অপেক্ষা করছিলেন সঠিক সময় ও সুযোগের। ২০২৬ সালে এসে দেখা গেল, মহিলা সংরক্ষণের সঙ্গে নিপুণভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ডিলিমিটেশন ও ইউনিয়ন টেরিটোরিজ আইন বিল। প্রিয়াংকা গািন্ধ ঠিকই বলেছিলেন, পুরুষদের আসল উদ্দেশ্য মহিলারা ঠিকই বুঝতে পারেন। এই সংযুক্তিকরণ আসলে দক্ষিণ ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমিয়ে হিন্দি বলয়ের আসন সংখ্যা বাড়ানোর এক সুনিপুণ কৌশল। চাণক্যের চাল বুঝতে তাই আজ আর নারীদের দেরি হয়নি।
মহিলাদের নাম নিয়ে যুদ্ধ থেকে জবরদখল— সবই দেখেছে মানব প্রজন্ম। হেলেন অফ ট্রয় থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার তালিবান মহিলাদের উদ্ধারের মিথ্যে গল্প, কিংবা ইরানের মহিলাদের অধিকার রক্ষার নামে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার থেকে তিন তালাক— সবই করে পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের আসল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতার বিস্তার। এই ডিলিমিটেশন বিল মূলত রাজনৈতিকভাবে বিপন্ন করে দেবে দক্ষিণ ভারত থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক আঞ্চলিক শক্তিকে। বর্তমানে ডিলিমিটেশনের মূল ভিত্তি ধরা হচ্ছে ২০১১ সালের সেনসাস বা জনশুমারিকে। অথচ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১১ সালের পর থেকে ভারতের জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ হলে কেরল, তামিলনাডু, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের মতো দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর আসন সংখ্যা ব্যাপক হারে কমবে। হিন্দি বলয়ের রাজনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যারা বরাবর নিজেদের বলিষ্ঠ অবস্থান রেখেছে, সেই দলগুলো জনসংখ্যার ভিত্তিতে এই ডিলিমিটেশনের বিরোধিতা করে আসছিল। একমাত্র মহিলাদের প্রশ্নই পারত তাদের সবাইকে এই বিলকে সমর্থন জানাতে বাধ্য করতে।
পশ্চিমবঙ্গ বা তামিলনাডুর বিধানসভা ভোটের আবহে বিরোধীদের বেকায়দায় ফেলতেই রাজনীতির চাণক্য অমিত শা এই বিল সংসদে পেশ করেছিলেন। বিলটির বিরোধিতা করলে বিপুল পরিমাণ মহিলা ভোটারের সমর্থন হারানোর ভয়, আবার সমর্থন করলে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারানোর আশঙ্কা— এই দ্বিমুখী ফাঁদে বিরোধীদের আটকাতে চেয়েছিল সরকার। এই বিল পাশ হলে লোকসভার আসন সংখ্যা বেড়ে হত ৮৫০, যার সিংহভাগ আসত গোবলয় থেকে। বিরোধীদের অনড় অবস্থানে আপাতত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল আটকে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি নারী সংরক্ষণ ফের বিশবাঁও জলে? নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক দাবার চালে কিস্তিমাত করার প্রচেষ্টা? নারীদের প্রগতিশীল সমর্থক হিসেবে নিজেদের প্রমাণের যে সুযোগ সরকার নিতে চেয়েছিল, বিরোধীদের কট্টর প্রতিবাদে তা আপাতত থমকে দাঁড়িয়েছে।
আসলে ইতিহাস সাক্ষী, নারীদের সংগ্রামকে হাতিয়ার করে সব দলই ক্ষমতায় আসতে চায়, এমনকি চরম ডানপন্থী দলগুলোও। পাড়ার রকে বসা ছেলেদের মতো মা-বোনকে গালি দেওয়ার নামে মারামারি থেকে সিঁদুরের নামে যুদ্ধ—সবকিছুকেই জাস্টিফাই করার সুযোগ থাকে এই পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতিতে। ডিলিমিটেশন ও নারী সংরক্ষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয় হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু কৌশলে তাদের একসূত্রে বাঁধা হয়েছে। যে দলগুলোর নিজস্ব সাংসদ তালিকায় মুসলিম বা নারী সদস্যের সংখ্যা নগণ্য, যারা ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে সবথেকে কম মহিলা প্রার্থী দিয়েছে, তাদের কাছে নারী সুরক্ষা বা সংরক্ষণ কেবলই একটি রাজনৈতিক ‘গিমিক’। এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে যথার্থই বলেছিলেন, নারীরা পূজা নয়, সমান অধিকার চায়। এই সমান অধিকারের দাবি আদায়ে গীতা মুখোপাধ্যায়ের মতো নেত্রীরা ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও আসবেন। তাঁরা জানেন, সিঁদুরের পরিচয় দিয়ে যুদ্ধ নয়, বরং প্রান্তিক ও গরিবদের বিরুদ্ধে চলা নিঃশব্দ শোষণ বন্ধ করাই এখন আসল লড়াই। নারীরা তাঁদের অধিকার নিজেরাই অর্জন করে নেবেন, কোনও রাজনৈতিক চাণক্যের দাক্ষিণ্যে নয়।
(লেখক প্রাবন্ধিক)



