রাজু সাহা, শামুকতলা: কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘ছন্নছাড়া’ কবিতায় নেই রাজ্যের বাসিন্দাদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। বর্তমানে এই কবিতা লিখলে তিনি নিঃসন্দেহে এই ‘নেই রাজ্যের বাসিন্দা’ হিসেবে আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) কুস্তিগিরদের কথাই বলতেন। বলবেন নাই বা কেন, জেলায় যে কুস্তিচর্চার কোনও পরিকাঠামোই নেই। কুস্তির আখড়া থেকে শুরু করে জুতো, কস্টিউম এমনকি কুস্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ম্যাট, কোনওটাই এখানে নেই।
কিন্তু এত নেই-এর মাঝেও যেটা আছে তা হল, কিছু ছেলেমেয়ের প্রতিভা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সেটার ওপর ভর করেই তাঁরা কুস্তিচর্চা করে যাচ্ছেন। তাঁদের এই কসরতের সাফল্যও আসছে। ইতিমধ্যেই জেলার আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের বিন্দিপাড়া মজিদখানা, চেপানি সহ বিভিন্ন গ্রামের ছেলেমেয়েরা জেলা, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য পেয়েছেন। জেলার দুই তরুণ জাতীয় স্তরে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। রাজ্য স্তরেও এসেছে স্বর্ণপদক। জেলার একমাত্র মহিলা কুস্তিগির মৌসুমি রায় প্রবল আর্থিক অনটনের মধ্যেও নিয়মিত পরিশ্রম করে রাজ্য স্তরে ব্রোঞ্জ জিতে নজির সৃষ্টি করেছেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা যারা কুস্তি খেলছি, তারা প্রত্যেকেই অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা। কুস্তির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই।’
কার্যত একই কথা শোনা যায় সৌরভ বর্মন, রজনী রায়, সুরজিৎ মোদক, জয়ন্ত রায়, বুবাই রায়, মানিক রায়, নিমাই দাস, নন্দগোপাল দাসদের গলাতেও। তাঁরা প্রত্যেকে বর্তমানে নিয়মিত বিন্দিপাড়া গ্রামে খেলার মাঠে কুস্তিচর্চা করে যাচ্ছেন। তাঁরা জানান, কুস্তিচর্চা করার জন্য একটি হলঘর তাঁদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। এছাড়া ম্যাট, খেলার জন্য জুতো, কস্টিউম এবং অন্য সমস্ত সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। কোনও পরিকাঠামো না থাকায় তাঁরা গদাধর নদীর চরে বালিমাটিতে গিয়ে অনুশীলন করতে বাধ্য হচ্ছেন। জেলায় কোনও প্রশিক্ষক নেই। আন্তর্জাতিক কোচ এবং রেফারি ভূমিপুত্র নন্দন দেবনাথ তাঁদের ভীষণভাবে সাহায্য করেন এবং উৎসাহ জোগান। বর্তমানে কলকাতায় থাকলেও যখনই বাড়ি আসেন লাগাতার প্রশিক্ষণ দেন। এছাড়া দূরে থাকলেও ভিডিও তৈরি করেও পাঠান। তাঁর সহযোগিতা ছাড়া আমরা কোনওভাবেই এই সাফল্য পেতাম না। তবে সঠিক পরিকাঠামো পেলে এলাকার অনেক ছেলেমেয়ে কুস্তির প্রতি আগ্রহী হবে বলে তাঁদের বিশ্বাস।
তাঁদের কথায়, ‘নন্দন দেবনাথ না থাকলে আমাদের কোনওভাবেই কুস্তি খেলা সম্ভব হত না। আমাদের জেলায় রেসলিংকে এগিয়ে নিতে হলে উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা একান্তভাবে জরুরি। খেলোয়াড়দের সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করাও ভীষণভাবে প্রয়োজন। তার জন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের আবেদন জানাচ্ছি।’
পশ্চিমবঙ্গ রেসলিং অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক নন্দন দেবনাথ বলেন, ‘দূরে থাকলেও ওদের সহযোগিতা বা উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি। পরিকাঠামো এবং সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। সেই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছি। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হবে।’

